একই গ্রামের গৃহবধূ সাফিয়া আক্তার বলেন, ‘এক লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার কথা বলে এনআইডি কার্ডের ফটোকপির সঙ্গে এক হাজার করে টাকাও নিয়েছে আমাদের এলাকা থেকে। আমাদের বাড়ির তিনজন এক হাজার করে টাকা দিয়েছে।’

এনআইডি কার্ড সংগ্রহে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গ্রামের নারী ও তরুণীদের ব্যবহার করছে চক্রটি। বেশ কয়েকটি এলাকায় গিয়ে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে জড়ো করছেন নারীদের। পরে সেখান থেকে শিক্ষিত ও চৌকস দেখে উপজেলাভিত্তিক নিয়োগ করা হচ্ছে এজেন্ট। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশিদের যেসব কালোটাকা সুইস ব্যাংকে জমা পড়ে আছে, সেগুলো কিছুদিনের মধ্যেই উদ্ধার করে গরিব-অসহায় কর্মমুখী মানুষের মধ্যে বিনা সুদে বিতরণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে জনপ্রতি দেওয়া হবে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা। আর যাঁরা মোটামুটি স্বাবলম্বী ও ব্যবসায়ী, তাঁদের এক লাখ থেকে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা দেওয়া হবে। শর্ত হিসেবে প্রতি মাসে এক হাজার টাকা করে কিস্তি দিলেই চলবে। কার্ড নেওয়ার পর আগে ঋণ দেওয়ার কথা বলে এক হাজার টাকা করেও নিচ্ছে অনেকের কাছ থেকে।

জাঙ্গাল গ্রামের বাবুল মিয়া বলেন, ‘আমার বাড়িতে কয়েক দিন আগে এ এম ফজলুল কাদের (বাবুল দারোগা) এসে সভা করে গেছেন। সেই সভায় তিনি বলে গেছেন, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের যে কালোটাকা পড়ে রয়েছে, তা দেশে এনে আমাদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হবে। এক লাখ থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হবে।’

চক্রটির অন্যতম সংগঠক করিমগঞ্জের পিটুয়া গ্রামের এ এম ফজলুল কাদের ওরফে বাবুল একসময় পুলিশের কনস্টেবল ছিলেন। তিনি বলেন, তাঁদের সংগঠনের নাম অহিংস গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশ। ঢাকার  সিটি কলেজের পাশে তাঁদের প্রধান কার্যালয়। সেখান থেকে তাঁদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, এলাকা থেকে এনআইডি কার্ড সংগ্রহ করে পাঠাতে। সুইস ব্যাংকের কালোটাকা দেশে এনে সাধারণ মানুষের মধ্যে দেওয়া হবে। তাই এনআইডি কার্ড সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠাচ্ছেন। ইতিমধ্যে তিনি করিমগঞ্জ উপজেলা থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার এনআইডি কার্ড ঢাকা অফিসে পাঠিয়েছেন।

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশ্রাফুল আলম বলেন, মিথ্যা আশ্বাসে এনআইডির অনুলিপি নেওয়া প্রতারণার শামিল। এ ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

অহিংস গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশ নামে সংগঠনটির কিশোরগঞ্জের দায়িত্বে আছেন ফেরুনা আক্তার। তিনি থাকেন রাজধানীর রায়েরবাগ এলাকায়। তাঁর বাড়ি কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার ধলা গ্রামে। তাঁর সঙ্গে কথা হয় মুঠোফোনে। তিনি বলেন, প্রতি শনিবার ঢাকা অফিসে বসেন তিনি। সংগঠনের চেয়ারম্যান তাঁকে কিশোরগঞ্জের দায়িত্ব দিয়েছেন। এরপর তিনি বিভিন্ন উপজেলায় গিয়ে নারীদের মাধ্যমে আইডি কার্ড সংগ্রহ করছেন। এখন আর নিজে মাঠপর্যায়ে যান না। তাঁর মাধ্যমে দায়িত্বপ্রাপ্তরাই কাজ করছেন। এ পর্যন্ত জেলা থেকে লক্ষাধিক এনআইডি কার্ডের অনুলিপি কেন্দ্রীয় অফিসে জমা দিয়েছেন। তাঁরা সবাই কিছুদিনের মধ্যেই বিনা সুদে ঋণ পাবেন। তিনি আরও বলেন, কিশোরগঞ্জ থেকে লক্ষাধিক এনআইডি কার্ডের অনুলিপি সংগ্রহ করে দেওয়ায় অফিসপ্রধান খুশি হয়ে সুনামগঞ্জের দায়িত্বটাও তাঁকেই দিয়েছেন। তবে টাকা নেওয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেছেন।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র রাষ্ট্রীয় সম্পদ। একজনের পরিচয়পত্রের অনুলিপি আরেকজনের কাছে থাকবে কেন? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রাসেল শেখ বলেন, ইতিমধ্যে বিষয়টি তিনি জেনেছেন। শিগগির এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।