কোথাও ঐক্য, কোথাও অনিশ্চয়তা

রাজধানী লাগোয়া পাঁচটি সংসদীয় আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা।

মনোনয়নপত্র যাচাই–বাছাই শেষে কোথাও দলীয় বিভেদ সামলে ঐক্যের বার্তা, কোথাও প্রার্থিতা বাতিল ও আপিল ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আবার কয়েকটি আসনে জোটের ‘একক প্রার্থী’ নিয়ে এখনো কোনো ঘোষণা না থাকায় ভোটারদের মধ্যে নানা জল্পনা–কল্পনা চলছে। এই চিত্র ঢাকা জেলার পাঁচটি (রাজধানীর ১৫টি বাদে) সংসদীয় আসনে।

রাজধানী লাগোয়া দোহার, নবাবগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, সাভার ও ধামরাই উপজেলা নিয়ে পাঁচটি সংসদীয় আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা। যদিও একাধিক আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) অন্যান্য দলের উপস্থিতি নির্বাচনী হিসাবকে কিছুটা ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

বর্তমানে ঢাকা-১ আসনে পাঁচজন, ঢাকা-২ আসনে দুজন, ঢাকা-৩ আসনে আটজন, ঢাকা-১৯ আসনে নয়জন এবং ঢাকা-২০ আসনে ছয়জন বৈধ প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। এলাকাগুলোতে প্রার্থীদের ব্যক্তি পরিচিতি, সাংগঠনিক শক্তি ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা ভোটের অঙ্কে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটার ও নেতা–কর্মীরা।

ঢাকা-১ (দোহার-নবাবগঞ্জ)

বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আবু আশফাক। ঢাকা জেলা বিএনপির এই সভাপতি দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) আবদুল মান্নানের মেয়ে মেহনাজ মান্নানের পক্ষের নেতা-কর্মীরা ‘অসন্তুষ্ট’ হন। তবে ২০ ডিসেম্বর নবাবগঞ্জের প্রার্থীর উপস্থিতিতে এক সভায় ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দেন মেহনাজ। খন্দকার আবু আশফাক বলেন, দলের সব নেতা–কর্মী ঐক্যবদ্ধ হয় তাঁর পক্ষে কাজ করছেন। তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে কার্যক্রম চলছে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জনগণ তাঁর পক্ষে রায় দেবেন—এমনটাই প্রত্যাশা তাঁর।

আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। ইসলামী ছাত্রশিবিরের এই সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইউরোপ ও যুক্তরাজ্য জামায়াতের মুখপাত্র। সম্প্রতি নানা কর্মসূচির মাধ্যমে এলাকায় প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন কোনো ফ্যাসিবাদের উত্থান হতে দেওয়া যাবে না। আশা করি এ আসনের সাধারণ মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেবে।’

আসনটির অন্য প্রার্থীরা হলেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী নাসির উদ্দিন মোল্লা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ফরহাদ হোসাইন ও বাংলাদেশ লেবার পার্টির শেখ মো. আলী। এর মধ্যে প্রধান দুই দলের প্রার্থীর বাড়িই নবাবগঞ্জের কলাকোপা গ্রামে হওয়ায় ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।

ঢাকা-২ আসন (কেরানীগঞ্জ ও সাভারের একাংশ)

বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি ও চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান। যাচাই–বাছাইয়ে জামায়াতের প্রার্থী কর্নেল (অব.) আবদুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছিলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। পরে তিনি প্রার্থিতা ফিরে পেতে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী জহিরুল ইসলাম।

অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের সংগঠন রাওয়ার সভাপতি আবদুল হক ৫ আগস্টের পর বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে এলাকায় প্রচার চালিয়ে আসছিলেন। বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে শেষ মুহূর্তে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। আবদুল হক মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সত্যের জয় হয়েছে। আশা করছি জনগণের বিপুল ভোটে আমি জয়ী হব।’

কেরানীগঞ্জের আঁটিবাজার এলাকার ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান (৪৬) বলেন, ‘যিনি এলাকায় উন্নয়ন করবেন, জনগণের কথা শুনবেন, আমরা তাঁকেই চাই। শুধু পোস্টার আর প্রচারণা নয়, যিনি পাঁচ বছর মানুষের পাশে থাকবেন, আমরা তাঁকেই ভোট দেব।’

ঢাকা-৩ (কেরানীগঞ্জের একাংশ)

মনোনয়নপত্র যাচাই–বাছাইয়ে অর্ধেক প্রার্থী ঝরে পড়েছেন। বৈধ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে আছেন আটজন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও জামায়াতের ঢাকা জেলার নায়েবে আমির শাহীনুর ইসলামের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা। অন্য প্রার্থীরা হলেন গণসংহতি আন্দোলনের বাচ্চু ভূঁইয়া, ইসলামী আন্দোলনের সুলতান আহম্মেদ খান, গণফোরামের রওশন ইয়াজদানি, গণ অধিকার পরিষদের মো. সাজ্জাত, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মোহাম্মদ জাফর ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রার্থী মজিবুর হাওলাদার।

শাহীনুর ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব জনগণের দোরগোড়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছি।’ একটি গোষ্ঠী তাঁদের পোস্টার ও লিফলেট ছিঁড়ে ফেলাসহ নেতা-কর্মীদের বিভিন্নভাবে বাধা দিচ্ছিল বলে অভিযোগ করেন এই প্রার্থী।

অভিযোগের বিষয়ে বিএনপির প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় বলেন, ‘আমরা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য লড়াই–সংগ্রাম করেছি। জামায়াতের প্রার্থীর কর্মী ও এজেন্টদের হয়রানি করার অভিযোগটি সঠিক নয়। এমন রাজনীতি আমরা কোনো দিন করিনি, করবও না।’

ঢাকা-১৯ (সাভার)

১১ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। এর মধ্যে ৯ জনের বৈধ ঘোষণা করা হয়। এখানে বিএনপির প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় সহপরিবার কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। তিনি ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপির মনোনয়নে এমপি হয়েছিলেন। দলের আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী ঢাকা জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব খান মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত দাখিল করেননি। দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, ‘ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়েছি। নেতা-কর্মীরাও গিয়েছেন।’

জামায়াত এই আসনে প্রার্থী করেছে ঢাকা জেলার সেক্রেটারি মো. আফজাল হোসাইনকে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবাই ইতিবাচক পরিবর্তন চায়। আমরাও সেই লক্ষ্যে কাজ করছি এবং ভবিষ্যতেও করব।’

এনসিপির প্রার্থী হিসেবে দলের যুগ্ম সদস্যসচিব ফয়সাল মাহমুদ (শান্ত) মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক দিলশানা পারুল মনোনয়নপত্র জমা দেন। জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে শেষ পর্যন্ত জোটের ‘একক প্রার্থী’ হিসেবে কে থাকছেন, তা নিয়ে আলোচনা আছে। দিলশানা পারুল বলেন, ‘জেনেছি জোটের প্রার্থী হিসেবেই ঢাকা-১৯ আসনে আমাকে প্রার্থী করা হয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে যেকোনো বিষয়ে দলের সিদ্ধান্তই হবে আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।’

আসনটিতে আরও প্রার্থী হয়েছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) মো. ইসরাফিল হোসেন সাভারী, জাতীয় পার্টির (জাপা) মো. বাহাদুর ইসলাম, গণ অধিকার পরিষদের (জিওপি) শেখ শওকত হোসেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ ফারুক খান ও খেলাফত মজলিসের এ কে এম এনামুল হক।

ঢাকা-২০ (ধামরাই)

বিএনপির প্রার্থী ধামরাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. তমিজ উদ্দিন। ঢাকা জেলা যুবদলের সভাপতি মো. ইয়াছিন ফেরদৌস ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক নাজমুল হাসান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও জমা দেননি। মো. তমিজ উদ্দিন বলেন, ‘ভোটারদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের চেষ্টা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমার অবস্থানের কারণে ভোটারদের কাছে আমার প্রতি আস্থা রয়েছে বলে মনে করি।’

জামায়াতের প্রার্থী ঢাকা জেলার নায়েবে আমির মো. আবদুর রউফ। জামায়াতের জোটে থাকা এনসিপি প্রার্থী করেছে নাবিলা তাসনিদকে। তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে দলের একাংশের নেতা-কর্মীরা তাঁকে ধামরাইয়ে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করেন। নাবিলা তাসনিদের দাবি, পাঁচ-ছয়জন দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়েছিলেন। পরে তাঁরা ভুল বুঝতে পেরেছেন। আসনটিতে আরও তিনজন প্রার্থী হয়েছেন। তাঁরা হলেন খেলাফত মজলিসের মো. আশরাফ আলী, জাতীয় পার্টির আহছান খান ও বাংলাদেশ জাসদের মো. আরজু মিয়া।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন শামসুজ্জামান, সাভার, ইকবাল হোসেন, কেরানীগঞ্জআজহারুল হক, নবাবগঞ্জ, ঢাকা]