২০১৯ সালে ভাঙন রোধে প্রকল্পের কাজ শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকায় ৮ কিলোমিটার নদীর তীর রক্ষা বাঁধ ও ১১ কিলোমিটার নদীর চর খননের কাজ শুরু হয়। ওই প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। আর পদ্মা নদীর উত্তর তীরের চরআত্রা ও নওপাড়া এলাকায় ৫৫০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২০ সালে। নড়িয়া উপজেলা সদরে আরেকটি হাসপাতাল নির্মাণকাজও শুরু হয়েছে। 

২০১৯ সালের পর নড়িয়ায় পদ্মার ভাঙন থেমেছে। কিন্তু ২০ হাজার গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন। গৃহহীন পরিবারগুলোর মধ্যে অনেকে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। কারও কারও আশ্রয় হয়েছে ঢাকার বিভিন্ন বস্তিতে। অনেকে বিভিন্ন ফসলি জমি ভাড়া নিয়ে ছাপড়া তুলে বসবাস করছে। সরেজমিনে ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নড়িয়ার বিভিন্ন সড়কের পাশে, ফসলি জমিতে ও বাগানে অন্তত পাঁচ হাজার পরিবার জমি ভাড়া নিয়ে ছাপড়ায় বাস করছে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) এক চেয়ারম্যান বলেন, নদীভাঙনের পর অনেক পরিবারকে ঘর নির্মাণের টিন দেওয়া হয়েছিল। মানুষ তো জমি হারিয়েছে, জমি না পেলে তারা ঘর তুলবে কোথায়? স্থানীয় প্রশাসন গৃহহীনদের খাসজমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। 

কেদারপুর ইউনিয়নের চরজুজিরা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন ইয়াকুব আকন ও রিনা আক্তার দম্পতি। তাঁদের ১৫০ শতাংশ ফসলি জমি ও ৩০ শতাংশের বসতবাড়ি ছিল। কৃষিকাজ ও গবাদিপশুর খামার করে তাঁদের সংসার চলত। ২০১৫-১৮ সাল পর্যন্ত তিন দফা ভাঙনে তাঁদের ফসলি জমি ও বসতবাড়ি বিলীন হয়ে যায়। পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে তাঁরা আশ্রয় নেন কেদারপুরের লস্কর বাড়ির বাগানে। 

রিনা আক্তার বলেন, ‘স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখেই ছিলাম। পদ্মার ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরছি। স্বামী মাটি কাটার শ্রমিকের কাজ করেন। আর আমি গ্রামে ঘুরে সেলাইয়ের কাজ করি। পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছি।’ 

কেদারপুরের বাসিন্দা মুকুন্দ বাছার স্থানীয় মুলফতগঞ্জ বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন। ১৫ শতাংশ জমির ওপর ছিল তাঁর বসতবাড়ি। ২০১৮ সালের ভাঙনে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি পদ্মায় বিলীন হয়। নিঃস্ব মুকুন্দ গ্রামের একটি বাগানে আশ্রয় নেন। হাটবাজারে ঝালমুড়ি বিক্রি করে পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। 

মুকুন্দ বাছার বলেন, ‘জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে এমন অসহায় হয়ে পড়ব, ভাবতেও পারিনি। কেউ আমাদের পাশে দাঁড়ায় না। আমাদের কথা ভাবে না। মরার পর একটু মাটিও পাব না।’ 

নড়িয়ার ইউএনও রাশেদুজ্জামান বলেন, ভাঙনে নিঃস্ব ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজনকে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর দেওয়া হয়েছে। 

জেলা প্রশাসক পারভেজ হাসান বলেন, ‘নদীভাঙনে যাঁরা ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, তাঁদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে। অনেককে খাসজমি দেওয়া হয়েছে। আর পদ্মা নদীর উত্তর তীরের চরআত্রা ও নওপাড়ায় অনেক খাসজমি রয়েছে। কেউ চাইলে সেখানে আমরা তাঁদের পুনর্বাসন করতে পারব।’