ভোটের মাঠ জমিয়ে তুলেছেন মুন্সিবাড়ির ছোট ছেলে আখতার হোসেন

শেষ মুহূর্তে প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির রংপুর–৪ আসনের প্রার্থী আখতার হোসেন। মোটরসাইকেলে নেতা–কর্মীদের নিয়ে গ্রামে গ্রামে ভোটারদের কাছে ছুটে চলেছেন। শুক্রবার দুপুরে রংপুরের কাউনিয়া চর হক বাজার এলাকায়ছবি: মঈনুল ইসলাম

প্রত্যন্ত গ্রামের বাড়ির উঠানে গোল করে সাজিয়ে রাখা প্লাস্টিকের চেয়ার। মাঝখানে কাঠের একটি টি–টেবিল। সেখানেই চলছে পাড়া–প্রতিবেশী ও কর্মীদের চা–নাশতার আপ্যায়ন। উঠানে কখনো প্রতিবেশী যুবকেরা প্রার্থীর প্রতীকের স্লোগান তুলছেন। কখনো স্লোগানে সুর মেলাচ্ছেন প্রার্থী, কখনো হাততালি দিয়ে নেতা–কর্মীদের উৎসাহিত করছেন।

রংপুর–৪ (কাউনিয়া ও পীরগাছা) আসনে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেনের বাড়ির দৃশ্য এটি। তাঁর বাড়ি রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর ইউনিয়নের মুন্সিপাড়ায়। এলাকাটি রংপুরের কাউনিয়া–পীরগাছা ও কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সীমানা লাগোয়া।

আজ শুক্রবার সকাল ৯টা। রংপুর থেকে ৩০ কিলোমিটার পূর্ব–দক্ষিণে এই গ্রামটিতে যাওয়ার উদ্দেশ্য আখতার হোসেনের প্রচার–প্রচারণা সরেজমিনে দেখা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে আখতার হোসেনের নির্বাচনী প্রচারণা সেল থেকে জানানো হয়, আজ দুপুর পর্যন্ত আখতার কাউনিয়ার হারাগাছ ইউনিয়নে প্রচারণা চালাবেন। একই উপজেলার শহীদবাগ ইউনিয়নে প্রচারণা চালাবেন সন্ধ্যা পর্যন্ত। রাতে তাঁর বালাপাড়া ও টেপামধুপুর ইউনিয়নে প্রচারণার কথা রয়েছে।

আজ সকালে আখতারের বাড়ি যাওয়ার পর দেখা গেল, কিছুক্ষণ পাড়া–প্রতিবেশীদের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের পর নির্বাচনী প্রচারণায় যাওয়ার জন্য মাইক্রোবাসে উঠছেন তিনি। সেখানেও তাঁকে গোটা পাঁচেক মানুষ ঘিরে নানা সমস্যার কথা বললেন। ভোট নিয়েও বুদ্ধি–পরামর্শ দিলেন কেউ কেউ।

জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৫ লাখ ৯ হাজার ৯০৬ ভোটারের বিপরীতে এ আসনে প্রার্থী ৯ জন। আখতার হোসেন ছাড়া আসনটিতে প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির মোহাম্মদ এমদাদুল হক ভরসা, জাতীয় পার্টির আবু নাসের শাহ মো. মাহবুবার রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. জাহিদ হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আবু সাহমা, বাসদের (মার্ক্সবাদী) প্রগতি বর্মণ, বাংলাদেশ কংগ্রেসের উজ্জল চন্দ্র রায় এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়নুল আবেদীন ও শাহ্ আলম বাসার। তবে ভোটাররা বলছেন, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আখতার, এমদাদুল হক ও আবু নাসেরের মধ্যে।

‘মুন্সিবাড়ি’ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে

আখতার হোসেনকে ঘিরে তাঁর বাড়ির উঠানে নেচে-গেয়ে স্লোগান দিচ্ছেন পাড়া প্রতিবেশীরা
ছবি: প্রথম আলো

আখতার হোসেনের গ্রামের বাড়িটি পরিচিত মুন্সিবাড়ি নামে। বাড়ির সামনের দিকে ৬০–৪০ ফুট দৈর্ঘ্যের চৌচালা ঘর। তাঁর বাবা মৌলভি আবদুস সালাম ছিলেন স্থানীয় ভায়ারহাট মাদ্রাসার আরবি শিক্ষক। প্রয়াত হন ২০১২ সালে। আখতারের বড় ভাই মোহাম্মদ আলী জানান, তাঁর বাবা শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষিকাজ করতেন। পাঁচ ভাই ও চার বোনের মধ্যে আখতার হোসেন সবার ছোট।

আখতারদের উঠানে কথা হয় তাঁর গৃহশিক্ষক মাজেদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, আখতারের দাদা তুফান মুন্সি ছিলেন তাঁদের বাড়ির সামনের গ্রামের মসজিদের ইমাম। তাঁর নামের সঙ্গে মিল রেখে গ্রামের নামকরণ করা হয় ‘মুন্সিপাড়া’। তাঁর বাবা আবদুস সালাম ও বড় ভাই মোহাম্মদ আলীও ওই মসজিদের ইমাম ছিলেন। গ্রামে এই পরিবারটিকে মানুষ সম্মান করেন।

আখতার হোসেনের পরিবার, শিক্ষক ও প্রতিবেশীরা জানান, আখতার পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পার্শ্ববর্তী সরদা তালুক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। ২০১৩ সালে তিনি স্থানীয় ভায়ারহাট পিয়ারিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করেন। ২০১৫ সালে রংপুরের ধাপ সাতগড়া কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করেন। ২০১৫–১৬ শিক্ষাবর্ষে আখতার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। ২০২২ সালে তিনি আইন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

ভোটের মাঠে প্রতিবাদী মুখ

মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আখতার হোসেনের রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা জাগ্রত হয়। মুন্সিপাড়া গ্রামে কথা হয় তাঁর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শহিদুল ইসলামের সঙ্গে। নির্বাচনী দায়িত্ব থাকায় তিনি নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে চাইলেন না। শুধু এতটুকু বললেন, আখতার সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন।

আহমদ আলী নামে আখতারের আরেক বড় ভাই বলেন, ভোটের মাঠে আখতারের প্রতিবাদী ভূমিকা উঠে আসছে। ভোটাররা প্রশংসা করছেন। আহমদ আলী জানান, আখতার ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে টানা তিন দিন অনশন করেন। এ ঘটনায় আখতার ব্যাপক আলোচিত হন। ২০১৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সমাজকল্যাণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

রংপুরের কাউনিয়ার একতাবাজার এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় আখতার হোসেন
ছবি: প্রথম আলো

২০১৮ সালের পর আরও নানা আন্দোলনে সামনের পর্যায়ের নেতা ছিলেন আখতার হোসেন। এসব তুলে ধরে প্রথম আলোকে আখতার জানান, ২০২১ সালে মোদিবিরোধী আন্দোলনের পর, ২০২২ সালে বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার স্মরণসভায় ও ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই শহীদ আবু সাঈদ হত্যার প্রতিবাদে পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গায়েবানা জানাজার ঘটনায় শেখ হাসিনার সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করে। তবে কখনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি তিনি। ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন।

আখতারের প্রচার–প্রচারণায় পিছু নেওয়ার পথে মুন্সিপাড়া মোড়ে দুই নারীকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভোটের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। তাঁদের একজন শোভা রানী বলেন, ‘হামার এলাকার ছাওয়া, হামারে মুখের সামনোত বড় হইছে। হামরা পাশাপাশি এলাকার। হামরা মানুষোক বুক ফুলি বলতে পারমো, হামরা এমপি এলাকার মানুষ। হামার ছওয়া এবার এমপি হইবে।’

প্রচারণায় পিছু পিছু

সকাল ১০টার দিকে কাউনিয়া–টেপামধুপুর সড়কের দুই পাশে শাপলা কলি ও ধানের শীষ প্রতীকের ব্যানার ও বিলবোর্ড সমানতালে দেখা গেল। কাউনিয়া বাজারে রিকশাচালক মজিদুল বলেন, ‘জামায়াত সমর্থন দেওয়ায় আখতারের ভোট আগাইছে। সে শিক্ষিত। এটা মানুষ দেখছেন। আর এবার টাকা দিয়ে ভোট করার খাওয়া নাই।’
কাউনিয়া থেকে হারাগাছ যাওয়ার পথে তপিকল বাজারে কয়েকজন পাটশ্রমিকের কাছেও আসনটিতে ভোটের লড়াই নিয়ে জানতে চাওয়া হয়। জৈয়নুদ্দিন নামের একজন বলেন, ‘সবগুলো আছে। ধানের শীষ, শাপলা কলির খুব কনটেস্ট হবে। কায় হবে, কবার পাবার নই।’

বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত আখতার হোসেনের মোটরসাইকেল শোডাউনের সঙ্গে হারাগাছের একতা বাজার, পল্লী মাড়ি, চর হকবাজার ও নাজিরদহ এলাকায় ঘোরেন এই প্রতিবেদক। এ সময় অন্য মোটরসাইকেলে তাঁর গানম্যান রোকনুজ্জামানকেও দেখা গেল। আখতার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে ভোটারের সঙ্গে কথা বলছেন। সালাম দিচ্ছেন। অনেক বয়স্ক ভোটারও তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।

আখতার হোসেন ভোটারদের সঙ্গে কথোপকথনে তাঁর পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে জরুরি রোগী ও গর্ভবতী নারীদের জন্য সরাসরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করবেন। স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে এলাকায় স্বাভাবিক প্রসবের ব্যবস্থা করবেন। কাউনিয়া ও পীরগাছায় একটি করে জনসেবা সেন্টার গড়ে তোলা হবে।

‘জমিদারি ভাঙতে হবে’

মোটরসাইকেলে নেতা–কর্মীদের নিয়ে গ্রামে গ্রামে ভোটারদের কাছে ছুটে চলেছেন আখতার হোসেন
ছবি: প্রথম আলো

রংপুর–৪ (কাউনিয়া ও পীরগাছা) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রহিম উদ্দিন ভরসার ছেলে এমদাদুল হক ভরসা এবার এই আসনের বিএনপির প্রার্থী। এই আসনে রহিম উদ্দিন ভরসার ভাই করিম উদ্দিন ভরসাও দুবার জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত হন। এসব কারণে এই আসন ভরসা পরিবারের দখলে এমন হিসাব–নিকাশ রাজনৈতিক মহলে আছে। ‘বিড়ি অঞ্চল’খ্যাত হারাগাছ এলাকাটিও এই পরিবারের ভোটব্যাংক হিসেবে ধরা হয়।

তবে আখতার হোসেন নির্বাচনে মাঠে নেমে শুরু থেকে পরিবর্তনের কথা বলছেন। নতুন বন্দোবস্তের কথা বলছেন। আখতার প্রথম আলোকে বলেন, ‘রংপুর–৪ আসনের অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র হলেও এই আসনে যাঁরা সংসদ সদস্য হয়েছিলেন, তাঁরা শিল্পপতি। এটাও একটা জমিদারি প্রথা। আমরা এই জমিদারি প্রথা ভাঙার কথা বলছি। লোকজন সাড়া দিচ্ছেন।’