কুমিল্লায় লরিচাপায় নিহত একই পরিবারের চার সদস্যকে বহন করা প্রাইভেট কারটি উল্টো পথে নয়, সঠিক লেনেই ছিল। গাড়িটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চট্টগ্রামমুখী লেন থেকে ইউটার্ন দিয়ে ঢাকামুখী লেনে প্রবেশের সময় সেটিকে চাপা দেয় দ্রুতগতিতে আসা একটি লরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সিসিটিভি ফুটেজে এ দৃশ্য দেখা গেছে। যদিও ঘটনার পর হাইওয়ে পুলিশের সদস্যরা ও স্থানীয় লোকজন দাবি করেন, প্রাইভেট কারটি উল্টো পথে যাচ্ছিল।
শুক্রবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড–সংলগ্ন উত্তর রামপুর এলাকার ইউটার্নে লরিচাপায় একই পরিবারের চারজন নিহত হন। তাঁরা হলেন জেলার বরুড়া উপজেলার হোসেনপুর গ্রামের উমর আলী (৮০), তাঁর স্ত্রী নুরজাহান বেগম (৬৫), বড় ছেলে আবুল হাসেম (৫০) এবং আরেক ছেলে আবুল কাশেম (৪৫)। এর মধ্যে আবুল হাসেম প্রাইভেট কারের চালকের আসনে ছিলেন। বাবা-মায়ের চিকিৎসা শেষে তাঁদের নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন দুই ভাই।
এ দুর্ঘটনার পর ‘বিপজ্জনক’ সেই ইউটার্ন সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। শনিবার বিকেলে পাঁচটার দিকে ইউটার্নটি বন্ধ করা হয়। এদিন বেলা ১১টার দিকে সেনাবাহিনীর ২৩ বীরের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসানসহ হাইওয়ে পুলিশ এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কুমিল্লার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আদনান ইবনে হাসান জানান, রোববার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে পরিবহন–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে প্রশাসনের আরও একটি সভা হবে। সেখানে ইউটার্নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। তবে আপাতত আজকে থেকেই ইউটার্নটি বন্ধ রাখা হচ্ছে। কারণ, এই ইউটার্নটি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত সব যানবাহন পাশের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা পরিষদের পাশের দয়াপুর এলাকা দিয়ে ইউটার্ন করবে। আর পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার ইউলুপের কাজ চলমান। সেটি চালু না হওয়ায় যানবাহনের চালকদের সতর্কতার সঙ্গে রাস্তা অতিক্রম করতে হবে।
শুক্রবার রাতে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ঢাকা থেকে আসা চট্টগ্রামমুখী লেনের প্রাইভেট কারটি পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড–সংলগ্ন উত্তর রামপুর এলাকার ইউটার্ন নেওয়ার চেষ্টা করছিল। এ সময় ঢাকামুখী লেনে উল্টো পথে যাচ্ছিল হানিফ পরিবহনের একটি এসি বাস। এমন সময় চট্টগ্রামের দিক থেকে ঢাকামুখী লেনে দ্রুতগতিতে আসছিল ওই লরিটি। প্রাইভেট কারটি ইউটার্নে প্রবেশ করতেই দ্রুতগতিতে আসা লরিটি সেটির ওপর উল্টে যায়। লরিটি উল্টে গেলে সেটির সিমেন্টবোঝাই কনটেইনারের নিচে প্রাইভেট কারটি চাপা পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই চারজন নিহত হন। একই সময় ওই লরির নিচে চাপা পড়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক ও দুই যাত্রী গুরুতর আহত হন।
নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছে, প্রাইভেট কার ইউটার্ন করে একটু সামনেই থাকা কুমিল্লা-চাঁদপুর সড়ক হয়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিল ওই চারজনের।
এদিকে এ ঘটনায় শুক্রবার রাতে নিহত ওমর আলীর ভাই আবুল কালাম বাদী হয়ে সড়ক পরিবহন আইনে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় মামলা করেছেন। মামলায় লরি ও উল্টো পথে আসা হানিফ পরিবহন বাসের অজ্ঞাতনামা চালকদের আসামি করা হয়েছে। তবে শনিবার বিকেল পর্যন্ত ওই চালকদের শনাক্ত করা যায়নি বলে জানিয়েছেন ময়নামতি হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আনিছুর রহমান।
আনিছুর রহমান বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার জন্য লরি ও হানিফ পরিবহনের বাসের চালক দায়ী। মামলার অভিযোগে নিহত ওমর আলীর ভাই দুই চালকের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের আটকের চেষ্টা চলছে। প্রাইভেট কারটি ইউটার্নের সময় লরিটি দ্রুতগতিতে আসায় এবং উল্টো পথে হানিফ বাস আসায় এমন ঘটনা ঘটেছে।
প্রসঙ্গত, কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার হোসেনপুর গ্রামের ওমর আলী ও তাঁর স্ত্রী নুরজাহান বেগমের চার ছেলেমেয়ের সবাই ঢাকায় থাকেন। মাস দেড়েক আগে স্বামী-স্ত্রী ঢাকায় ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলেন সন্তানদের কাছে। ঢাকায় যাওয়ার পর বড় ছেলের বাসার ছাদে পড়ে গিয়ে ঊরুতে ব্যথা পান ওমর আলী। সন্তানদের বাসা আর হাসপাতাল মিলে প্রায় দেড় মাস চিকিৎসাধীন তিনি। একটু ভালো লাগতেই কয়েক দিন ধরেই দুই ছেলেকে বলছিলেন বাড়ি ফেরার কথা। বাবা-মায়ের পীড়াপীড়িতে বড় ছেলে আবুল হাসেম নিজের গাড়িতে করেই রওনা হন হোসেনপুর উদ্দেশে। তাঁদের সঙ্গী হন ওমর আলীর ছোট ছেলে আবুল কাশেমও। নিজের গাড়ির চালকের আসনে আবুল হাসেম। কিন্তু বাড়ির কাছাকাছি এসেও বাড়ি ফেরা হলো না তাঁদের। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল সবার। একই পরিবারের চারজনকে একসঙ্গে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ পরিবারের সদস্যরা। আর গ্রামের চারজনকে হারিয়ে কাঁদছে হোসেনপুরের মানুষ।