ছিটকে পড়ার শঙ্কায় বিএনপির প্রার্থী, ভোটের মাঠে নতুন সমীকরণ

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে শেরপুরের নির্বাচনী মাঠ এখন সরগরম। জেলার তিনটি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ১৬ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। যাচাই-বাছাইয়ে বিএনপির এক প্রার্থীসহ ছয়জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় ভোটের মাঠে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।

জেলার তিনটি আসনের মধ্যে দুটিতেই বিএনপির দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি একজন করে নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। অপর দিকে দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে শেরপুর–২ আসনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তবে ফাহিম চৌধুরী আশা করছেন, আপিলে তিনি প্রার্থিতা ফিরে পাবেন। তিনটি আসনেই জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

তফসিল অনুযায়ী রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করা যাবে ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি। ইসি আপিল নিষ্পত্তি করবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। এরপর নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা জানা যাবে।

শেরপুর–১ (সদর)

শেরপুর–১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মোট সাতজন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। শনিবার যাচাই–বাছাইয়ে জাতীয় পার্টির মাহমুদুল হকের (মনি), মো. ইলিয়াস উদ্দিনের ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সফিকুল ইসলামের মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এমন অবস্থায় ভোটের মাঠ কিছুটা ফাঁকা হলেও বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখনো আলোচনার কেন্দ্রে। আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক সানসিলা জেবরিন (পিয়াংকা)। তবে জেলা বিএনপির আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম (মাসুদ) দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় দলের ভেতরে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ে দুজনের মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দলীয় প্রার্থীর প‌রিবর্তন চে‌য়ে আবেদন ক‌রে‌ছিলাম। এতে সাড়া না পে‌য়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হ‌য়ে‌ছি। তৃণমূ‌লের নেতা-কর্মীসহ ভোটাররা আমা‌কে দারুণভা‌বে সমর্থন দি‌য়ে‌ছেন।’

বিএনপির প্রার্থী সানসিলা জেবরিন বলেন, ‘দলের নেতা–কর্মী নিয়ে ধানের শীষের পক্ষে সকাল–সন্ধ্যা এলাকায় প্রচারণা করেছিলাম। আপাতত স্থগিত রয়েছে। ভোটারদের কাছ থেকে দারুণ সাড়া পেয়েছি।’

এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো. রাশেদুল ইসলাম (রাশেদ)। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের মজলিশে শুরা সদস্য। এনসিপির প্রার্থী হিসেবে লিখন মিয়া নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। আসনটিতে তুলনামূলক তরুণ প্রার্থীর লড়াই নিয়ে ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

শেরপুর–২ (নকলা–নালিতাবাড়ী)

যাচাই–বাছাইয়ে শেরপুর-২ আসনের বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। বিএনপির মনোনয়নপ্রতাশী হিসেবে এলাকায় গণসংযোগ করে আসা প্রবাসী ইলিয়াস খানেরও মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির প্রার্থী রফিকুল ইসলামের (বেলাল) মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে ঋণখেলাপির কারণে। ফলে আসনটিতে বর্তমানে বৈধ প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন জামায়াতের মু. গোলাম কিবরিয়া ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবদুল্লাহ আল কায়েস।

এলাকার অনেক ভোটার বলছেন, যদি শেষ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের জোট হয়, তাহলে গোলাম কিবরিয়া কিংবা আবদুল্লাহ আল কায়েসকে নির্বাচন থেকে সরে যেতে হবে। অপর দিকে ম‌নোনয়নপত্র বাতিল হওয়া প্রার্থীরা যদি আপিলেও বৈধতা না পান, তাহলে আসনটিতে বিনা ভোটে একজনের সংসদ সদস্য হওয়ার সম্ভাবনা র‌য়ে‌ছে।

অবশ্য জামায়া‌তের প্রার্থী মু. গোলাম কিব‌রিয়া প্রথম আলোকে ব‌লেন, ‘দলীয় প্রার্থী ঘোষণার পর থে‌কে নেতা-কর্মী ও সমর্থক‌দের নি‌য়ে এলাকায় ব‌্যাপক প্রচারণা চা‌লি‌য়ে‌ছি। দলীয় জো‌টের ব‌্যাপা‌রে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দেখ‌তে পাচ্ছি না। সম‌য় গেলে বোঝা যা‌বে, ত‌বে দলীয় প্রার্থী হি‌সে‌বে নির্বাচ‌নের মা‌ঠে কাজ ক‌রে যা‌চ্ছি।’

রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ফাহিম চৌধুরী অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব ত্যাগের দাবি করলেও মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় কোনো দালিলিক প্রমাণ সংযুক্ত করেননি। প্রয়োজনীয় নথিপত্রের ঘাটতি থাকায় শেষ পর্যন্ত তাঁর মনোনয়নপত্রটি বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়।

মনোনয়ন বাতিলের বিষয়ে ফাহিম চৌধুরী বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে আপিল করব। আশা করি ন্যায়বিচার পাব। বিএনপি একটি বৃহৎ দল, এখানে ছোটখাটো মতভেদ থাকবেই। তবে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। সবাইকে মান–অভিমান ভুলে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার অনুরোধ জানাচ্ছি।’

শেরপুর–৩ (শ্রীবরদী–ঝিনাইগাতী)

জেলায় একমাত্র এই আসনেই জমা পড়া চার প্রার্থীর সবার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতীর পাহাড়ি ও সীমান্তবর্তী জনপথ নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক (রুবেল)। তিনি দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। অবশ্য ঝিনাইগাতী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলামও (বাদশা) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বৈধতা পেয়ে মাঠে আছেন।

 স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি তিনবার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও তিনবার ইউপি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছি। তৃণমূলের সাধারণ মানুষ সততার জন্য আমাকে পছন্দ করে। সেই বিশ্বাসের ওপর জনগণ আমাকে সমর্থন করে।’

বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক বলেন, ‘দুই উপজেলায় বিএনপির নেতা–কর্মী এককাট্টা হয়ে ধানের শীষের পক্ষে প্রতিদিন প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করেছিলাম। এখন ভোটাররা সচেতন, দলের প্রার্থী রেখে তাঁরা অন্য কাউকে সমর্থন দেবেন না।’

এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী মু. নুরুজ্জামান (বাদল)। তিনি জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি। ভোটের মাঠে তিনি তুলনামূলক নতুন মুখ। এখানে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন আবু তালেব মো. সাইফুদ্দিন।