নুসরাত ফতেহ আলী থেকে সুবীর নন্দী—টানা গেয়ে যান নিরাপত্তা প্রহরী জোবায়ের
মাত্র চার বছর বয়স থেকেই গান গাওয়ার প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। তবে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো চর্চা তিনি করতে পারেননি। তাঁর বাবাও ছিলেন চায়ের দোকানি। স্বল্প আয়ের এ সংসারে কোনো রকমে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছেন তিনি।
রাত তখন ১১টা। ছোট্ট চায়ের দোকানে নিরাপত্তা প্রহরীর পোশাকে এক যুবক। তিনিই এই দোকানের মালিক। অর্ডার পেলে চা বানিয়ে গ্রাহকদের হাতে দিচ্ছেন। সেই সঙ্গে সুরেলা গলায় গাইছেন গান। গানের রুচিও আছে তাঁর। রাহাত ফতেহ আলী খান, নুসরাত ফতেহ আলী খান, সুবীর নন্দী ও সঞ্জীব চৌধুরীর গান টানা গেয়ে যান তিনি।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেটের রেল ক্রসিং এলাকায় দেখা যায় এ দৃশ্য। গান গাওয়া যুবকের নাম মোহাম্মদ জোবায়ের (৩১। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা প্রহরী (অস্থায়ী) পদে কর্মরত। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেল ক্রসিং এলাকার মো. ইয়াসিনের ছেলে।
বৃদ্ধ বাবা, অসুস্থ মা, স্ত্রী ও এক বছর বয়সী এক শিশু নিয়ে জোবায়েরের সংসার। চায়ের দোকানের আয় ও স্বল্প বেতনের প্রহরীর চাকরিতে সংসারের সব সময়ই অনটন লেগে থাকে। এ কারণে হতাশও হন বারবার। সেই হতাশা ভুলতেই তিনি গান করেন।
গত শনিবার রাতে দোকানে গিয়ে কথা হয় জোবায়েরের সঙ্গে। চা বিক্রির এক ফাঁকে তিনি জানান, মাত্র চার বছর বয়স থেকেই গান গাওয়ার প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। তবে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো চর্চা তিনি করতে পারেননি। তাঁর বাবাও ছিলেন চায়ের দোকানি। স্বল্প আয়ের এ সংসারে কোনো রকমে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছেন তিনি। এরপর সংসারের দায়িত্ব আসে তাঁর কাছে। কোনো চাকরি না পেয়ে ২০১৬ সালেই নিজেই চায়ের দোকান দেন। সেই থেকে তিনি এভাবেই চলছেন।
এ চায়ের দোকানে কাজ করতে করতেই মোহাম্মদ জোবায়ের ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি নেন। চাকরির এক মাসের মাথায় তিনি বিয়ে করেন। তবে এর মধ্যেই তাঁর মায়ের প্যারালাইসিস ধরে পড়ে। এরপর পরিবারের খরচও বেড়ে যায়। তাই বাধ্য হয়ে দিনের বেলায় প্রহরীর দায়িত্ব পালন শেষে রাতে আবার চায়ের দোকানে বসেন।
জোবায়ের বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে তিনি এই দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু চাকরির কারণে চায়ের দোকানটি আর আগের মতো চালানো সম্ভব হয় না। আগে দোকানে বসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গান গাইতেন। তাঁদের উৎসাহই তাঁর ভরসা ছিল।
নিজের কষ্টের কথা জানিয়ে জোবায়ের বলেন, ‘বর্তমানে সংসারের চাপ আরও বেড়েছে। অসুস্থ মা, ছোট সন্তান—সব মিলিয়ে দিন পার করা কঠিন হয়ে উঠেছে। বাইরে থেকে তাঁকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরের সংগ্রামটা কেউ দেখে না। একদিন কাজ করতে না পারলে সেই দিনের আয়ের সুযোগও হারাতে হয়। তাই একসময় শখের বশে গান গাইলেও এখন কষ্ট ভুলতে গান গাই।’
অবশ্য সারা জীবনই গান চালিয়ে যেতে চান জোবায়ের। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা প্রহরীর চাকরিটা স্থায়ী হলে সংসারে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে। তখন গান নিয়ে আলাদা করে ভাববেন। একদিন ভরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি গান গাইবেন। এমন সুযোগ পেলে তিনি নিজেকে প্রমাণ করে দেবেন।