ভারতের উপকূলে জাহাজডুবিতে নিখোঁজ মামুন, দুই সন্তানকে নিয়ে স্বজনদের অপেক্ষা

জাহাজডুবিতে নিখোঁজ ছোট ভাই আবদুল্লাহ আল মামুনের কথা বলতে গিয়ে কাঁদতে থাকেন তাঁর মেজ ভাই আবদুল্লাহ আল মাহমুদ। সোমবার দুপুরে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার উত্তর কাটিয়া এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার উত্তর কাটিয়া এলাকায় তিনতলা বাড়িটি বাইরে থেকে নীরব। সিঁড়িতে পা রাখতেই চোখে পড়ে সারি করে রাখা জুতা। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই শোনা যায় কান্নার শব্দ। একটি কক্ষের বিছানায় বসে আছেন নিখোঁজ মেরিন ইঞ্জিনিয়ার (নৌ প্রকৌশলী) মো. আবদুল্লাহ আল মামুনের বড় ভাই আবদুল্লাহ আল বাকী। তাঁর কোলে মামুনের চার বছরের ছেলে মুয়াজ ও আট বছরের মেয়ে জান্নাত।

আবদুল্লাহ আল বাকীর মুঠোফোনটি বারবার বেজে উঠছে। ফোন এলেই স্বজনেরা ছুটে আসছেন—হয়তো মামুনের কোনো খবর এসেছে; কিন্তু প্রতিবারই ফিরতে হচ্ছে হতাশ হয়ে।

সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মামুনের বাড়িতে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়। ভারতের ওডিশা উপকূলের কাছে বঙ্গোপসাগরে পানামার পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজ ‘এমভি ওশান উইনার’ ডুবে যাওয়ার পর থেকে নিখোঁজ মামুন। তাঁর অবস্থান সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পায়নি পরিবার।

মামুনের বড় ভাই আবদুল্লাহ আল বাকী বলেন, ‘বারবার মানুষ ফোন করে জানতে চাইছে, মামুনের কোনো খোঁজ পাওয়া গেছে কি না; কিন্তু আমরা এখনো কিছুই জানি না। ওর ছোট সন্তান দুটিরও এখনো কিছু বোঝার বয়স হয়নি। নানা শঙ্কায় আমাদের মন মানছে না।’

মুঠোফোনে শেষ স্মৃতি

বাকীর কোলে চুপচাপ বসে ছিল মুয়াজ ও জান্নাত। বাবার ফেরার অপেক্ষায় থাকা এই দুই শিশুকে ঘিরেই এখন পরিবারের সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ।

বাকী মুঠোফোনে দেখালেন, ছোট ভাইয়ের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে হওয়া শেষ কথোপকথন। দেখালেন, জাহাজ থেকে মামুনের পাঠানো কয়েকটি ভিডিও। কোনো ভিডিওতে সমুদ্রের মধ্যে জাহাজ চলছে, কোনো ভিডিওতে জাহাজের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন মামুন। মুঠোফোনের পর্দায় থাকা এসব ভিডিওই এখন পরিবারের কাছে মামুনের শেষ দৃশ্যমান স্মৃতি।

বাকী জানান, মামুন ডিপ্লোমা মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। গত এপ্রিলের শেষ দিকে এমভি ওশান উইনার জাহাজে যোগ দেন তিনি। ‘ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে জাহাজটিতে কাজ করছিলেন। গত বুধবার হোয়াটসঅ্যাপে মামুনের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয়। বৃহস্পতিবার মামুনের স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়। এরপর শুক্রবার জাহাজটি ভারতের ওডিশা থেকে আকরিক লোহা নিয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। পরে জাহাজডুবির খবর পান তাঁরা।

‘কাউকে সান্ত্বনা দিতে পারছি না’

মামুনের মেজ ভাই আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাড়ির আরেকটি কক্ষে বসে কাঁদছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা শুধু শুনেছি, জাহাজ ডুবে গেছে। এরপর মামুনের আর কোনো খোঁজ পাইনি। আমার বৃদ্ধ মা-বাবা, মামুনের স্ত্রী—কাউকে সান্ত্বনা দিতে পারছি না। সবাই ভেঙে পড়েছে।’ একটু থেমে তিনি আবার বলেন, ‘দুজন উদ্ধার হয়েছে, এটুকু জানতে পেরেছি; কিন্তু আমার ভাইসহ বাকিদের কোনো খোঁজ নেই। আমরা সরকারের কাছে সঠিক তথ্য চাই। আমার ভাই যেন সুস্থ অবস্থায় আমাদের কাছে ফিরে আসে।’

মামুনের বৃদ্ধ চাচা আতিয়ার রহমানও এসেছেন বাড়িতে। তিনিও কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলেটা বেঁচে আছে কি না, কী অবস্থায় আছে—একটু যদি জানতে পারতাম, তাহলে অন্তত মনটারে বুঝ দিতে পারতাম।’

আবদুল্লাহ আল মামুনের দুই সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে আছেন তাঁর বড় ভাই আবদুল্লাহ আল বাকী। সোমবার দুপুরে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার উত্তর কাটিয়া এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

মামুনের খোঁজ চায় পরিবার

পরিবারের পক্ষ থেকে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে সেখান থেকেও মামুনের বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তাঁর ভাই বাকী। তিনি বলেন, ‘শিপিং কোম্পানি কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেটিও জানি না।’

জাহাজডুবির পর ৭০ ঘণ্টার বেশি সময় পেরিয়ে গেছে বলে জানান বাকী। সাগর উত্তাল থাকায় উদ্ধার অভিযান কঠিন হচ্ছে বলেও তাঁরা জানতে পেরেছেন। বাকী বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার যেন ভারত সরকারের সঙ্গে, বিশেষ করে ভারতের কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে। এতে উদ্ধার তৎপরতা আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে। আমরা যত দ্রুত সম্ভব মামুনের খোঁজ চাই।’

২৪ জনের মধ্যে উদ্ধার দুজন

ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমভি ওশান উইনার জাহাজটিতে মোট ২৪ জন ক্রু ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২০ জন চীনের, তিনজন মিয়ানমারের ও একজন বাংলাদেশের নাগরিক। জাহাজডুবির পর এখন পর্যন্ত দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি নাবিকদের সন্ধানে ভারতের কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী অভিযান চালাচ্ছে।

জীবিত উদ্ধার হওয়া দুই চীনা নাবিকের বরাত দিয়ে জার্মানির সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে জানিয়েছে, জাহাজটি হঠাৎ এক পাশে কাত হয়ে যায়। এরপর প্রায় আট মিনিটের মধ্যে পুরোপুরি ডুবে যায়। জাহাজটি দ্রুত ডুবে যাওয়ায় সব নাবিকের নিরাপদে লাইফ রাফটে (জীবনরক্ষাকারী ভেলা) ওঠার সুযোগ হয়নি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিখোঁজ নাবিকদের সন্ধানে ভারতের কোস্টগার্ডের তিনটি জাহাজ তল্লাশি চালাচ্ছে। এর পাশাপাশি ভারতের নৌবাহিনীর দূরপাল্লার সামুদ্রিক টহল বিমান ও জাহাজও অনুসন্ধানে যুক্ত রয়েছে।

তবে এসব তথ্যেও স্বস্তি ফিরছে না উত্তর কাটিয়ার বাড়িটিতে। মুঠোফোনে থাকা মামুনের ভিডিও, শেষ কথোপকথন আর পুরোনো স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আছেন স্বজনেরা। পাশে বসে আছে তাঁর দুই সন্তান। তাঁদের একটাই অপেক্ষা—মামুনের কোনো খবর আসুক, তিনি যেন জীবিত ফিরে আসেন।

আরও পড়ুন