হালিমা-স্বপন দম্পতির সেই রিকশা ছিনতাই হয়ে গেছে

গত ৮ সেপ্টেম্বর হালিমার স্বামী স্বপন মিয়ার হাতে রিকশাটি তোলে দেন পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীক। রিকশাটি ছিনতাই হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন স্বপন
ফাইল ছবি

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে চরম দারিদ্র্যের কারণে হাসপাতালে যেতে না পেরে একাই সন্তান জন্ম দেওয়া সেই হালিমা বেগম ও স্বপন মিয়া দম্পতির রিকশাটি ছিনতাই হয়েছে। গত বৃহম্পতিবার ভোরে উপজেলার গোলাকান্দাইল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে থেকে রিকশাচালক স্বপন মিয়াকে মারধর করে ছিনতাইকারীরা রিকশাটি নিয়ে যায়। এ ঘটনায় গতকাল শনিবার বিকেলে স্বপন মিয়া রূপগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

আরও পড়ুন

জিডি সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো গত বৃহস্পতিবার ভোরে স্বপন মিয়া রিকশা নিয়ে বের হন। ভোর সাড়ে পাঁচটায় ভুলতা উড়ালসড়কের নিচ থেকে তিনজন ছিনতাইকারী যাত্রীবেশে তাঁর রিকশায় ওঠে। তাদের নিয়ে স্বপন মিয়া এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের গোলাকান্দাইল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে গেলে দুজন লোক সামনে থেকে রিকশাটির গতিরোধ করে। পরে রিকশায় থাকা তিনযাত্রী অন্য দুজনের সঙ্গে মিলে স্বপন মিয়ার পেটে ও গলায় ছুরি ধরে তাঁকে মারধর করে রিকশাটি ছিনিয়ে নেয়। বিষয়টি নিয়ে কোনো প্রকার বাড়াবাড়ি করলে স্বপন মিয়াকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানিসহ হত্যার হুমকি দিয়ে ছিনতাইকারীরা চলে যায়।

আরও পড়ুন

এ ঘটনায় আজ রোববার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল হকের সঙ্গে দেখা করে এই দম্পতি রিকশা ছিনতাইয়ের বিষয়টি জানিয়েছেন। পরে ইউএনও তাঁদের রিকশা উদ্ধারে ব্যবস্থা নেওয়ার অশ্বাস দেন।

এদিকে উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন রিকশা ছিনতাইয়ের পর স্বপন মিয়া শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। আজ রোববার দুপুরে মুঠোফোনে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্বপন কান্নায় ভেঙে পড়েন। স্বপন বলেন, ছিনতাইকারীদের মারধরের কারণে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। গত তিন দিন কোনো কাজ না করায় ঘরের খাবার ফুরিয়ে গেছে। রিকশাটি ফিরে না পেলে কীভাবে সংসার চালাবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

পুলিশ রিকশাটি উদ্ধারের চেষ্টা করছে জানিয়ে রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এফ এম সায়েদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর সঙ্গে সঙ্গে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছি। এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। ভোরবেলা অনেক কুয়াশা থাকায় ক্যামেরায় খুব বেশি কিছু দেখা যাচ্ছে না। আশা করছি, আমরা খুব দ্রুতই ছিনতাইকারীদের শনাক্ত করে রিকশাটি উদ্ধার করতে পারব।’

গত সেপ্টেম্বরে অভাবের কারণে এক দম্পতির সদ্যোজাত সন্তানকে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়ার খবর রটে। সেই খবরের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে হালিমা বেগম ও স্বপন মিয়া দম্পতির দুঃখমাখা জীবনের নির্মম সত্য বেরিয়ে আসে। জানা যায়, রিকশা ভাড়ার অভাবে হাসপাতালে যেতে না পেরে হালিমা বেগম নিজের ঘরে একাই সন্তান প্রসব করেন। অভাবের কারণে লালনপালন করতে না পারার শঙ্কা থেকে তাঁদের সদ্যোজাত সন্তানকে অপরিচিত আরেক দম্পতির কাছে দত্তক দেন। সন্তান জন্ম দেওয়ার পর বিনা চিকিৎসায় অন্ধকার ঘরে ব্যথায় ছটফট করছিলেন হালিমা বেগম।

ঘরে থাকা আরও তিন সন্তানকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছিল তাঁদের।
ঘটনা জানতে পেরে গত ৫ সেপ্টেম্বর ‘সন্তান বিক্রির তথ্য যাচাই করতে গিয়ে জানা গেলো নির্মম সত্য’ শিরোনামে প্রথম আলো সংবাদ প্রকাশ করে। সঙ্গে সঙ্গেই বিষয়টি নিয়ে দেশ বিদেশে ব্যাপক সাড়া পরে। অনেকেই এই দম্পতির প্রতি সহায়তার হাত বাড়ান। গত ৮ সেপ্টেম্বর রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীক স্বপন মিয়ার হাতে একটি রিকশা ও নগদ টাকা তুলে দেন। এরপর থেকে সেই রিকশা চালিয়েই তিন সন্তান ও স্ত্রী হালিমা বেগমকে নিয়ে সংসার চলছিল স্বপনের।