চট্টগ্রাম নগরে যে কারণে ভোটারদের উপস্থিতি কম ছিল

চট্টগ্রাম নগরের শহীদ নগর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভোটারদের লাইন। ১২ ফেব্রুয়ারি সকালে তোলাছবি: সৌরভ দাশ

চট্টগ্রাম নগরের দরবেশীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে একটি কেন্দ্রের ভোটার সংখ্যা ২ হাজার ৯৮১ জন। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনের এই কেন্দ্রে কেবল ৪০৭ জন তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। আনুপাতিক হিসাবে এটি ওই কেন্দ্রের মোট ভোটারের ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। চট্টগ্রামের ১৪টি আসনের সব কেন্দ্রের মধ্যে এই হার সর্বনিম্ন।

অবশ্য শুরু এই কেন্দ্রে নয়, চট্টগ্রাম নগরের চারটি আসনেই এবার ভোটের হার ছিল জেলার আসনগুলোর তুলনায় কম। চট্টগ্রামে নগরের চারটি আসনে গড়ে ভোট পড়েছে ৪৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। অন্যদিকে জেলার ১০টি আসনে ভোটের হার ছিল গড়ে ৫৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয় থেকে পাওয়া কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রামে ১৬টি সংসদীয় আসন রয়েছে। চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) ও চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপির প্রার্থীরা এগিয়ে থাকলেও ফলাফল ঘোষণা স্থগিত রয়েছে। বাকি ১৪ আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে। এ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৬ হাজার ৫৯ জন। যার মধ্যে ৩ লাখ ২০ হাজার ৫১১ বা ৬৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

চট্টগ্রামে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে। এ আসনে ৪ লাখ ৯৫ হাজার ২৭৮ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ২ লাখ ৬ হাজার ৬৮২ জন। শতাংশের হিসাবে এটি ৪১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এরপরই আছে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসন। এ আসনে মোট ভোটারের ৪২ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৬ হাজার ৩৬৩ জন। যার মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৪৪ জন। এ দুটিই নগরের আসন।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এবার নির্বাচন ঘিরে টানা ছুটি ছিল। নগরের ভোটার হলেও অনেকেই ছুটিতে বাড়িতে চলে গেছেন। ফলে নগরের যেভাবে ভোটার উপস্থিতির কথা ছিল, সেটি হয়নি। এ ছাড়া নগরের নির্দিষ্ট একটি অংশ ভোট দিতে যেতে চায় না। তবে এবার ভোটকেন্দ্রে ভোটের উপস্থিতি সার্বিক বিবেচনায় ভালো ছিল।

নগরের এবার ভোট কম

দেশে এর আগে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন ধরা হয় ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে। সে সময়ের ফলাফল, বিশেষ করে দেখা গেছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি ও সীতাকুণ্ড আসন ছাড়া বাকি ১৪ আসনে গড়ে ৮২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। এবারের নির্বাচনে নগর ও জেলায় ভোটের হারের পার্থক্য প্রায় ১১ শতাংশ। ২০০৮ সালে সেটি ছিল কেবল ৩ শতাংশ। তবে তখনো নগরের চার আসনের তুলনায় জেলায় ভোট বেশি পড়েছিল।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নগরের চট্টগ্রাম-১১ (তখন চট্টগ্রাম-১০) এবং চট্টগ্রাম-১০ (চট্টগ্রাম-৯) আসনের ভোটের হার তুলনামূলক কম ছিল। জেলায় গড়ে ৮৩ শতাংশ ভোট পড়লেও নগরের এই দুই আসনে ছিল ৭৫ শতাংশের আশপাশে। নগরের ৪টি আসনে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ভোট দিয়েছিলেন ৮০ জন। সেখানে জেলায় এ সংখ্যা ছিল ৮৩ জন। নগরের অধিকাংশ মানুষের বসবাস এই দুই আসনে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের দিন (১২ ফেব্রুয়ারি) নগরের চারটি আসনের অন্তত ৩০ থেকে ৩৫টি কেন্দ্র ঘুরে দেখেছেন প্রথম আলোর প্রতিবেদকেরা। এসব কেন্দ্রে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতি দেখা গেলেও দুপুরের পর উপস্থিতি কম ছিল। প্রায় সব আসনেই বিকেলে পর ভোটার উপস্থিতি কমেছে। তবে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণের সময় শেষেও লাইনে মানুষ ছিল।

নগরের সিএমপি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে মোট ভোটার ১ হাজার ৭৫৮ জন। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৪২১ জন। শতকরা হিসাবে এটি প্রায় ২৪ শতাংশ। জানতে চাইলে কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মো. রিয়াদ হোসেন বলেন, এই কেন্দ্রে অধিকাংশ ভোটার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য বা সরকারি কর্মকর্তা। হতে পারে বদলির কারণে তাঁরা চট্টগ্রামে নেই।

বন্দর-পতেঙ্গায় ভোট কম

কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম-১১ আসনে অন্তত ১১টি কেন্দ্রে ভোটের হার ২৫ শতাংশের কম। এর মধ্যে হালিশহর আহমাদ মিয়া সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে দুটি ভোটের হার ছিল ১৮ শতাংশের আশপাশে। বিদ্যালয়ের ১ নম্বর কেন্দ্রের ভোটের হার ছিল ১৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ। ২ নম্বর কেন্দ্রে ১৮ দশমিক ৫২ এবং ৩ নম্বর কেন্দ্রে ছিল ৩৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ। জানতে চাইলে ১ নম্বর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, সেখানে পোশাক কারখানার শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। তাঁরা সেখানকার বাসিন্দা ছিলেন, তবে হয়তো চাকরি বদলি করে অন্য জেলায় চলে গেছেন। এ কারণে ভোটার উপস্থিতি কম ছিল। ভোটের পরিবেশশৃঙ্খল ছিল।’

এ আসনে আরও ৫টি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয় ভোটার উপস্থিতি নিয়ে। তাদের ভাষ্য, নগরের যে ১০টি ওয়ার্ড নিয়ে চট্টগ্রাম-১১ আসন গঠিত, সে সব ওয়ার্ডে পোশাক ও কারখানা শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। ভাসমান মানুষও এই এলাকাগুলোতে বেশি। তাঁরা এখানকার ভোটার হলেও থাকেন অন্য জায়গায়। ফলে তাঁদের উপস্থিতি ভোটকেন্দ্রে ছিল না।

জানতে চাইলে নগরের তিন আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এবার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলাম, যাতে ভোটাররা নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে এসে ভোট দিতে পারেন। নগরের ভাসমান মানুষের সংখ্যা বেশি, অনেকের স্থায়ী ঠিকানা জেলায় বা উপজেলাগুলোতে। এ ছাড়া লম্বা ছুটি ছিল। কী কারণে মানুষ আসেনি সেটি খুঁজে বের করা হচ্ছে।’