চাকমা ভাষা লিখতে-পড়তে শেখান তরুণ আপন চাকমা
চাকমা জনগোষ্ঠীর নতুন প্রজন্মের কাছে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষার ব্যবহার কিছুটা কমেছে। আবার অনেকেই চাকমা ভাষা বলতে পারলেও লিখতে-পড়তে পারেন না। এ ধরনের মানুষদের চাকমা ভাষা শেখান রাঙামাটির তরুণ আপন চাকমা। মাতৃভাষার প্রতি টান থেকেই প্রায় দেড় বছর ধরে ভাষা শেখানোর এই কার্যক্রম চালাচ্ছেন তিনি।
আপন চাকমার বাড়ি রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সারোয়াতলী ইউনিয়নের পাক্কুয়াখালী গ্রামে। রাঙামাটি সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে সম্প্রতি স্নাতক (সম্মান) শেষ করেছেন তিনি। পড়ালেখার সুবাদে তিনি থাকেন রাঙামাটি শহরের কালিন্দিপুরে।
আপন চাকমা জানান, চাকমা বর্ণমালায় লেখাপড়া নিয়ে তাঁর আগ্রহ দীর্ঘদিনের। নিজের উদ্যোগে চাকমা ভাষা লেখা ও পড়ার চেষ্টা করতেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে রাঙামাটি শহরের কল্যাণপুরে চাকমা ভাষা নিয়ে ৮ দিনের একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রীদিসুদোম (ভালেদীজদা)। সেই কর্মশালায় তিনিও অংশ নেন। প্রশিক্ষণের মূল্যায়নে ভালো ফলাফল করেন তিনি। এরপর তিনি নিজেই চাকমা ভাষার প্রশিক্ষক হিসেবে রীদিসুদোমে কাজ শুরু করেন। এ পর্যন্ত ২৪০ জনকে হাতে-কলমে চাকমা ভাষা শিখিয়েছেন তিনি।
রীদিসুদোমে চাকমা ভাষা শেখার জন্য ৮ দিনের কর্মশালায় অংশ নিতে প্রশিক্ষণার্থীদের আগে ২০০ টাকা করে দিতে হতো। তবে সম্প্রতি সেটি বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক অনন্ত রঞ্জন চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, কর্মশালার প্রতিটি ব্যাচে ৩০ জন করে শিক্ষার্থী নেওয়া হয়। সাধারণত স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানোই থাকে অন্যতম লক্ষ্য। কর্মশালার শেষের দিকে মূল্যায়নের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের সনদ দেওয়া হয়। রীদিসুদোমে চাকমা ভাষা ছাড়াও নাচ, গান, গিটারসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রীদিসুদোমে চাকমা ভাষা পাঠদানের বিনিময়ে সম্মানী পান আপন চাকমা। এর পাশাপাশি তিনি টিউশন করেন। মাতৃভাষা শেখানোর এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে চান জানিয়ে আপন চাকমা বলেন, ‘রীদিসুদোমে আমার মতো আরও বেশ কয়েকজন চাকমা ভাষা শেখান। সবারই একটি প্রচেষ্টা এই ভাষা যাতে হারিয়ে না যায়। চাকমা কিশোর-তরুণেরাও এখন বেশ আগ্রহের সঙ্গে মাতৃভাষা শিখছেন। প্রশিক্ষণার্থীদের এই আগ্রহ আমাদের উৎসাহিত করে।’
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রীদিসুদোমের (ভালেদীজদা) সভাপতি রিনেল চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাহাড়ের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ ও সহায়তা আরও বাড়ানো দরকার। তবেই সব ভাষা রক্ষা পাবে।’
চাকমা ভাষার প্রশিক্ষক হিসেবে খ্যাতি রয়েছে রাঙামাটির বাসিন্দা প্রসন্ন কুমার চাকমার। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় পাঁচটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় বই দেওয়া হচ্ছে। তবে মাতৃভাষায় পাঠদানের বিষয়টি সেভাবে তদারকি করা হয় না। ভাষা না জানার কারণে অনেকে পড়াতেও পারেন না। তাই পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভাষায় দক্ষ শিক্ষক তৈরি হলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর প্রাক্-প্রাথমিকে চাকমা ভাষায় ৯ হাজার ৯৯৪টি, মারমা ভাষায় ২ হাজার ৪৫০টি ও ত্রিপুরা ভাষায় ৬৯০টি বই বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রথম শ্রেণিতে চাকমা ভাষায় ১৬ হাজার ২৩৯টি, মারমা ভাষায় ৩ হাজার ৬৩৬টি ও ত্রিপুরা ভাষায় ১ হাজার ৫টি; দ্বিতীয় শ্রেণিতে চাকমা ভাষায় ১৬ হাজার ৩৮৯টি, মারমা ভাষায় ৩ হাজার ৭৭৪টি ও ত্রিপুরা ভাষায় ১ হাজার ৪৪টি এবং তৃতীয় শ্রেণিতে চাকমা ভাষায় ৫ হাজার ৭৫৩টি, মারমা ভাষায় ১ হাজার ১৯০টি ও ত্রিপুরা ভাষায় ২৬২টি পাঠ্যবই বিতরণ করা হয়েছে।