সম্প্রসারণকাজ আর শেষ হয় না, বন্দীরা থাকছেন গাদাগাদি করে

ধারণক্ষমতার পাঁচ গুণের বেশি বন্দী থাকায় তাঁদের ব্যবস্থাপনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষকে।

ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী ধারণক্ষমতা ৪২৩ জন। এর বিপরীতে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন ২ হাজার ১৬৪ জন বন্দী। ধারণক্ষমতার পাঁচ গুণের বেশি বন্দী থাকায় তাঁদের ব্যবস্থাপনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষকে।

এদিকে বিপুলসংখ্যক বন্দীর চাপ সামলাতে ২০১৫ সালে কারাগার সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ প্রকল্প নেওয়া হয়। কিন্তু এখনো কাজ শেষ হয়নি। কয়েক দফা সময় ও ব্যয় বাড়ানোর পরও প্রকল্পের কাজ চলছে ধীরগতিতে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দাবি, প্রকল্পের প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে কারা কর্তৃপক্ষের হিসাবে দৃশ্যমান অগ্রগতি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের বেশি নয়।

কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বন্দীদের মধ্যে মাদক ও যৌতুক মামলার আসামির সংখ্যা বেশি। এ ছাড়া নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন মামলার আসামি এবং রাজনৈতিক মামলার আসামিরাও রয়েছেন।

সম্প্রসারণকাজ চলছে ১১ বছর

অবিভক্ত বাংলায় ময়মনসিংহ কারাগারের যাত্রা শুরু হয় ১৭৯২ সালে। ১৯৯৭ সালে এটি কেন্দ্রীয় কারাগারে উন্নীত হয়। বন্দীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় কারাগারের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ। ২০১৫ সালে দুই হাজার বন্দী রাখার সক্ষমতা এবং আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণে একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। ‘ময়মনসিংহ কারাগার সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ’ নামের প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয় ১২৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা। কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। ২০১৮ সালের জুনে কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় দুই বছর সময় বাড়ানো হয়।

গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের শুরুতেই পরিকল্পনাগত ত্রুটি ধরা পড়ে। ভবনের আয়তন ও নকশায় পরিবর্তন আনতে হয়। এর মধ্যে করোনার সময়েও প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। পরে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দেয়। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পের প্রথম সংশোধন করা হয়। এতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে প্রায় ২৪০ কোটি টাকা হয়। একই সঙ্গে ১৩টি প্যাকেজের পরিবর্তে প্যাকেজের সংখ্যা বাড়িয়ে ৩০টি করা হয়। বিভিন্ন ঠিকাদার এসব কাজ করছেন।

কারাগার সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় বন্দীদের ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হচ্ছে। প্রকল্পের একটি অংশের কাজ শেষ হয়েছে। নারী বন্দীদের জন্য নির্ধারিত অংশের কাজ শেষ হওয়ায় পুরুষ বন্দীদের সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে। নির্মাণকাজের জন্য পুরুষ বন্দীদের রাখার স্থানটি খালি রাখা হয়েছে।
মো. সোহরাব হোসেন, জেলার, ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার

প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আজহার আলী বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে প্রকল্পের প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আশা করছি, ওই সময়ের মধ্যে ডিপিপিতে থাকা কাজগুলো শেষ করতে পারব।’

স্থানান্তর করতে হচ্ছে বন্দীদের

গতকাল দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, কারাগার এলাকায় বিভিন্ন স্থানে নির্মাণকাজ চলছে। একই সঙ্গে প্রতিদিন নতুন বন্দী কারাগারে ঢুকছেন। বন্দীদের সঙ্গে দেখা করতে তাঁদের স্বজনদেরও কারাগারের সামনে ভিড় করতে দেখা যায়।

কারাগারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিনই বন্দীর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু তাঁদের রাখার ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছে না। অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে না পেরে গত দুই মাসে ময়মনসিংহ কারাগারে রাখার জন্য পাঠানো অন্তত ১ হাজার ৮০০ বন্দীকে পাশের তিনটি জেলা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আজহার আলী বলেন, পুরোনো স্থাপনা দ্রুত অপসারণের জন্য ঠিকাদারকে চাপ দেওয়া হচ্ছে। সেগুলো অপসারণ করা গেলে ওই জায়গায় নতুন ভবন নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

পাঁচ গুণ মানুষকে রাখা অমানবিক

গত মঙ্গলবার জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর কারা ফটকে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয়। নাম–পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কারাগারে বন্দীদের গাদাগাদি করে থাকতে হয়। টয়লেট ব্যবহারের জন্যও লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কারাগারে যাওয়ার পর তাঁর শরীরে চুলকানির সমস্যা দেখা দিয়েছিল।

সরকারেরই একটি অংশের দীর্ঘসূত্রতার কারণে কারাগার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বছরের পর বছর বিলম্বিত হয়েছে। এতে সরকারের ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি বন্দীদের দুর্ভোগও বেড়েছে। প্রকল্পের কাজ দীর্ঘায়িত ও বিলম্বিত হওয়ার জন্য যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দায়ী থাকে, তাদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।
আলী ইউসুফ, সুজনের ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক

ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মো. সোহরাব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, কারাগার সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় বন্দীদের ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হচ্ছে। প্রকল্পের একটি অংশের কাজ শেষ হয়েছে। নারী বন্দীদের জন্য নির্ধারিত অংশের কাজ শেষ হওয়ায় পুরুষ বন্দীদের সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে। নির্মাণকাজের জন্য পুরুষ বন্দীদের রাখার স্থানটি খালি রাখা হয়েছে।

প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য কারা কর্তৃপক্ষের কাছে নেই বলে জানান সোহরাব হোসেন। তিনি বলেন, দৃশ্যমানভাবে মনে হচ্ছে, কাজের অগ্রগতি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের বেশি নয়। কারাগারজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কাজ চলছে। এতে বন্দীদের ব্যবস্থাপনা ও স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

কারাগারে ধারণক্ষমতার প্রায় পাঁচ গুণ মানুষকে রাখা অমানবিক বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সরকারেরই একটি অংশের দীর্ঘসূত্রতার কারণে কারাগার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বছরের পর বছর বিলম্বিত হয়েছে। এতে সরকারের ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি বন্দীদের দুর্ভোগও বেড়েছে। প্রকল্পের কাজ দীর্ঘায়িত ও বিলম্বিত হওয়ার জন্য যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দায়ী থাকে, তাদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।