এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. মজিবুর রহমান বলেন, পাথর তোলার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৩ নভেম্বর কমিটির সদস্যরা সিলেটের কোয়ারিগুলো পরিদর্শনে আসবেন। তাঁরা সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখবেন পাথর তোলার যৌক্তিকতা আছে কি না। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।

পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়ার ক্ষমতা জেলা প্রশাসনের নেই বলে জানিয়েছেন মজিবুর রহমান। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি তিনি পরিবহন নেতাদের জানিয়েছেন। তাঁরা যাতে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করে দাবি জানাতে পারেন, সে সুযোগ করে দেওয়ারও আশ্বাস দিয়েছেন। নেতারা সাক্ষাতের সময় ধর্মঘট থেকে সরে আসার কথা জানিয়েছেন। তবে পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে তাঁরা ধর্মঘট পালনের কথা বলছেন।

বিভাগীয় ট্রাক পিকআপ কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক শাব্বীর আহমদ বলেন, জেলা প্রশাসক বলেছেন, কমিটি আসবে। কিন্তু এর আগেও একাধিক কমিটি পরিদর্শন করে ফিরে গেছেন। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। এ জন্য সংগঠনের অনেক নেতা ৩ নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে নারাজ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মঘট পালনের ব্যাপারে মত রয়েছে। তাঁরা কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।

এদিকে ধর্মঘট সফল করতে মালিক-শ্রমিকেরা রোববার দুপুরে সিলেট জেলা ট্রাক পিকআপ কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির কার্যালয়ে যৌথ সভা করেছেন। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা ট্রাক পিকআপ কাভার্ড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. দিলু মিয়া। বক্তব্য দেন জেলা ট্রাক পিকআপ কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সহসভাপতি আতিকুর রহমান, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নাজির আহমদ, জেলা ট্রাক পিকআপ কাভার্ড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতি আবদুস সালাম, সাধারণ সম্পাদক আবদুল গফুর, জেলা ট্রাক পিকআপ কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক জাকির হোসেন তালুকদার, বৃহত্তর সিলেট পাথরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সদস্যসচিব নুরুল আমিন, জাফলং স্টোন ক্রাশার মালিক সমিতির সভাপতি বাবলু বখত প্রমুখ।

সভায় বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সিলেটের পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ রোজগার হারিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সাম্প্রতিক বন্যায় বৃহত্তর সিলেটের মানুষের জীবন ও জীবিকা মারাত্মক সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। আয়রোজগার না থাকায় প্রান্তিক এই শ্রমজীবী মানুষেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। সিলেটের পাথর কোয়ারিসংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে বর্তমানে দুর্ভিক্ষাবস্থা বিরাজ করছে। শত শত ট্রাকমালিক, স্টোন ক্রাশার মালিক ও ব্যবসায়ী ব্যাংকঋণে জর্জরিত হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় দিন যাপন করছেন। অথচ পাথর কোয়ারি বন্ধ রেখে বিদেশ থেকে রিজার্ভের ডলার খরচ করে পাথর আমদানি করে উন্নয়নকাজ চালানো হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রীয় রিজার্ভ-সংকট, লাখো মানুষের জীবন রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় রিজার্ভের ডলার সাশ্রয়ের জন্য সিলেটের পাথর কোয়ারি জরুরি ভিত্তিতে খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।

নিন্দা জানিয়ে বিশিষ্টজনদের বিবৃতি

এদিকে পাথর উত্তোলনের দাবিতে পরিবহন ধর্মঘট আহ্বান করার বিষয়টি নিন্দনীয় ও দুঃখজনক বলে মনে করছেন সিলেটের ২০ বিশিষ্ট ব্যক্তি। রোববার রাতে তাঁরা এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, সিলেটের পিয়াইন, ডাউকি, ধলাই, রাংপানি, বিছনাকান্দি, উৎমাছড়া, লোভাছড়া ও ভোলাগঞ্জে যে আটটি পাথর কোয়ারি আছে, সেখানে নির্বিচারে পাথর তোলার কারণে পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিনষ্ট হয়েছে।

বিবৃতিদাতাদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য নাজিম কামরান, সুশাসনের জন্য নাগরিক সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদ উল্লাহ শহীদুল ইসলাম, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেটের সমন্বয়ক শাহ সাহেদা আখতার, সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সফিকুল ইসলাম, লেখক আবুল ফতেহ ফাত্তাহ ও এ কে শেরাম, সচেতন নাগরিক কমিটি সিলেটের সভাপতি সমিক শহিদ জাহান উল্লেখযোগ্য।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বেপরোয়া পাথর তোলায় সিলেটে ২০০৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১০৬ শ্রমিক নিহত হন। তবে উচ্চ আদালতের রায় ও সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সাল থেকে সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত ৮টি পাথর কোয়ারির ইজারা স্থগিতের পাশাপাশি পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়। এতে এসব এলাকায় প্রাণ ও প্রকৃতি ফিরতে শুরু করেছে।

বিশিষ্ট নাগরিকেরা বিবৃতিতে বলেছেন, সম্প্রতি পাথর উত্তোলনকারীরা নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থে আদালতের নির্দেশে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন ঘোষিত পিয়াইন, ডাউকি, ধলাই নদসহ সিলেটের অন্যান্য স্থানে পাথর উত্তোলনের অনুমতি প্রদানে সরকারের ওপর অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছেন। এমনকি শ্রমিকদেরও তাঁরা উসকে দিয়ে পাথর উত্তোলনে অনুমতি চাইছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় অযান্ত্রিক পদ্ধতিতেও খনিজ সম্পদ আহরণ আইনত অনুমোদিত নয়। সরকার নিশ্চিতভাবেই পিয়াইন, ডাউকিসহ রাংপানি, ধলাই, বিছনাকান্দি, উৎমাছড়া, লোভাছড়া ও ভোলাগঞ্জ এলাকায় পর্যটনশিল্পের বিকাশে একটি রূপরেখা ও মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে জায়গাগুলোর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা করতে পারে। কোনো অনৈতিক চাপের মুখে সরকার যেন জনস্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে, সেটা নিশ্চিত করার দাবি জানান বিশিষ্ট নাগরিকেরা।