পথের কুকুর-বিড়ালের ‘মা’ রওশন আরা
‘তোমার কুকুর ঘেউ করল কেন, তেড়ে এল কেন’—এ ধরনের ছোটখাটো অভিযোগ প্রায়ই শুনতে হয় রওশন আরাকে। একদিন তাঁর কুকুর বল্টু ঘেউ করায় ভয়ে রিকশাসহ গর্তে পড়ে যান এক চালক। এ ঘটনায় গ্রামের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর প্রায় দেড় মাস ধরে দিনের বেলায় পথের কুকুরদের খাবার দিতে পারেননি। বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) শরণাপন্ন হন।
স্মৃতি হাতড়ে রওশন আরা বলেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে কষ্টের সময় ছিল ওই দেড় মাস। রাতে শুধু একবার গোপনে পথকুকুরদের খাবার দিতে পেরেছেন। শেষ পর্যন্ত ইউএনওর কাছে আবেদন করে বলেন, ‘আমার কুকুর যদি গ্রামের একজন মানুষকেও কামড় দেয়, আমি আর কুকুরকে খাবার দেব না। কেউ তা প্রমাণ করতে পারেনি।’
রওশন আরার বাড়িতে বর্তমানে ৯টি বিড়াল ও ৭টি কুকুর আছে, সব কটিই রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছেন। শুধু নিজের বাড়িতেই নয়, গ্রামের আরও পাঁচ জায়গায় নিয়মিত কুকুরদের খাবার দেন। নানা বিপত্তির পরও তিনি পরম মমতায় প্রাণীগুলোকে আগলে রেখেছেন। সব মিলিয়ে তাঁর দেখভালে আছে ২০টি কুকুর ও ৯টি বিড়াল।
৪৭ বছর বয়সী রওশন আরার বাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার রঘুরামপুর গ্রামে। তিনি স্নাতক পাস এবং হাতিনাদা কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ প্রোভাইডার হিসেবে কাজ করেন। তাঁর স্বামী আজিজুল ইসলাম একজন কৃষক। বড় ছেলে রিয়াজুল ইসলাম পুলিশে কর্মরত। ছোট ছেলে রাফিউল এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে।
রওশন আরার দাবি, তাঁর পরিবারের সবাই এই প্রাণীদের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব রাখেন। এতে তাঁর পক্ষে প্রাণীগুলোর জন্য সময় দেওয়া অনেকটা সহজ হয়েছে। তাঁর দুই ছেলেই প্রাণীর প্রতি সহানুভূতিশীল। বড় ছেলের রেশনের চাল-আটাও বিড়াল-কুকুরের খাবারের কাজে লাগে।
প্রজনন মৌসুমে কুকুর-বিড়ালকে নিজ খরচে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন রওশন আরা। কারণ, বাচ্চা হলে অনেকেই সেগুলো মেরে ফেলে—এ দৃশ্য তাঁর সহ্য হয় না। রাস্তায় কোনো কুকুর-বিড়াল, কাঠবিড়ালি কিংবা পাখির বাচ্চা মৃত পড়ে থাকতে দেখলে দাফন না করে বাড়ি ফেরেন না।
যেভাবে মায়ায় জড়ান
পাঁচ বছর আগে গর্ভবতী ও অসুস্থ একটি কুকুর রওশন আরার বাড়িতে ঢুকে পড়ে। দুর্বল শরীরে এটি দাঁড়াতেও পারছিল না। পরে প্রাণীটিকে খাবার দেন, যত্ন নেন। এরপর আর বাড়ি ছাড়েনি কুকুরটি। আদর করে এর নাম দেন ‘দুলি’। এ নাম ধরে ডাকলেই সাড়া দিত প্রাণীটি। অন্যদিন আরেকটি কুকুর একইভাবে বাড়িতে ঢুকে পানি খেতে গিয়ে লুটিয়ে পড়ে। ওর সদ্যই বাচ্চা হয়েছিল, এ কারণে বেশ দুর্বল ছিল। কুকুরটিকে দেখে বেশ মায়া হয় রওশন আরার। এরপর এর নাম দেন ‘মায়া’। বাকি কুকুরগুলো তিনি রাস্তায় পড়ে থাকা অবস্থায় কুড়িয়ে এনেছেন।
বাড়ির কুকুরগুলোর আলাদা নাম রেখেছেন রওশন আরা। এগুলো হলো বাঘা, পুটুস, দুলি, লালু, ময়না, পেয়ারা ও টুসি। বিড়ালগুলোরও আছে আদুরে নাম—টুকটুকি, প্রজাপতি, টুকি, তনুমনু, বল্টু, মিঠু, রাজা, গুড্ডু ও টম।
পোষা বিড়ালগুলোর জন্য প্রতিদিন প্রায় এক কেজি করে মাছ কিনতে হয় বলে জানান রওশন আরা। তাঁর ভাষ্য, মাছ-ভাত ছাড়া খাবার খায় না প্রাণীগুলো। আর কুকুরের জন্য ভাতের সঙ্গে যখন যে সবজির দাম কমে, সেই সবজি কিনে আনেন। বিয়েবাড়ির উচ্ছিষ্ট খাবারের জন্য তিনি বালতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। এসব দেখে লোকজন তাঁর স্বামীকে মন্দ কথাবার্তা শোনান। রওশন আরা সেদিকে কান দেন না। কারণ, তিনি জানেন, কিছুক্ষণ পরই তাঁর স্বামী বাজার থেকে কুকুরের জন্য সবজি আর বিড়ালের জন্য মাছ কিনে বাড়ি ফিরবেন।
রওশান আরার পথের কুকুরগুলোর খাবার দেওয়ার জন্য আরও পাঁচটি বাড়ি আছে। এসব বাড়িতে খাবার দেওয়ার জন্য বাটিও রাখেন। বাড়িগুলোর মানুষ কুকুরগুলোর দিকে যাতে সুনজর রাখেন, এ জন্য মানুষগুলোরও যত্ন নিতে ভোলেন না রওশন আরা। কেউ অসুস্থ হলে নিজে ক্লিনিক থেকে ওষুধ এনে তাঁদের খেতে দেন।
আছে হারানোর বেদনা, প্রেরণা প্রাণীগুলোর ভালোবাসা
গত শীতে রওশন আরার বাড়িতে ১৮টি বিড়াল ছিল। ‘ক্যাট ফ্লু’তে সাত দিনের মধ্যেই মারা যায় ৯টি। ঝড়ের দিনে কুড়িয়ে পাওয়া একটি ইগলকে সুস্থ করে সাত মাস নিজের বাড়িতে রেখেছিলেন, নাম দিয়েছিলেন ‘সান’। এ নামে ডাকলেই ছুটে আসত পাখিটি। হঠাৎ একদিন অসুস্থ হয়ে সেটিও মারা যায়। সেই শোক এখনো কাটেনি রওশন আরার।
গত রোববার (১৩ জানুয়ারি) বিকেলে রওশন আরার বাড়িতে ঘুরে দেখা যায়, সেখানে কুকুর-বিড়ালগুলোর প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য একটি ক্লিনিক তৈরি করা হয়েছে। ক্লিনিকে দেখা মিলল তিনটি কুকুর ও দুটি বিড়ালের। বিড়ালগুলোর একটির নাম সিম্বা ও অন্যটি পিয়া। সিম্বা প্রায়ই রওশন আরার কোলে বসে থাকে। আর কুকুর দুটি নিচে, পায়ের কাছে।
বের হওয়ার আগে প্রাণীগুলোকে খাবার দিলেন রওশন আরা। এরপর গেলেন হাতিনাদা গ্রামের রফিকুল মেম্বারের বাড়িতে। সেখানে আছে ছয়টি কুকুর, এর মধ্যে দুটি মা। একটি মায়ের ছানাগুলোকে মেরে ফেলেছিল লোকজন। এরপর আরেকটি কুকুরের কয়েকটি ছানাকে বুকের দুধ খাওয়ায় ছানাহারা মা কুকুরটি।
এরপর বিড়ালদহ গ্রামের রুমি বেগমের বাড়িতে যেতেই রওশন আরার কাছে দৌড়ে এল দুটি কুকুর। তাঁকে কাছে পেয়ে প্রাণীগুলোর সে কী আনন্দ! কোনোটি কাপড় ধরে টান দেয়, কোনোটি আবার গা ঘষে ঘষে কোলে ওঠার আকুতি জানায়।
রওশন আরার পশুপ্রেমের বিষয়ে জানতে চাইলে সিমলা খাতুন (১৮) নামের এক প্রতিবেশী বলেন, ‘কুকুরের গায়ে পোকা হলে নিজেই হাত দিয়ে সেগুলো বের করে চিকিৎসা দেন। তিনি প্রকৃত অর্থেই একজন জীবপ্রেমী। মানুষ তো বটেই, কোনো প্রাণীর কষ্টই সহ্য করতে পারেন না। ছাগলের অসুখ হলেও দৌড়ে যান। এই যে দেখেন, পাশের বাড়িতে মানুষজন নাই, বেড়াতে গেছে। তাদের হাঁসগুলোকেও খাবার দিচ্ছেন এই রওশন আরাই।’
এবার জানতে চাওয়া হলো রওশন আরার কাছে। তিনি বললেন, ‘আমার পরিবারের কোনো ঋণ–দেনা নেই। অসুখবিসুখ নেই। একটাই দুঃখ, আমি বিড়ালগুলোকে একদিন ক্যাটফিস খাওয়াতে চাই। কিন্তু টাকা জোগাড় করতে পারি না।’ কথাগুলো শেষ হতেই আঁচলে চোখ মুছতে লাগলেন।
গ্রামে ঘুরে ঘুরে কুকুর-বিড়ালগুলোর খোঁজখবর আর খাবার দেওয়ার পর আবার বাড়ির পথ ধরেন রওশন আরা। বাড়িতে ঢুকে ব্যাগপত্র রেখে প্রথমেই বিড়ালগুলোকে খাবার দেন। কুকুরগুলো তখন ঠায় দাঁড়িয়ে। এর মধ্যে টুকি নামের একটি বিড়াল চোখে কম দেখে। ছেলেকে ডেকে বললেন, ‘রাফি, দেখতো টুকি কোতি?’ খুঁজে খুঁজে টুকিকে সঙ্গে নিয়ে এল রাফি।
প্রজাপতি নামের বিড়ালটি প্রজাপতির মতো চঞ্চল। দল বেঁধে খায় না সে। একটি দেয়ালের ওপর বসে বসে খাওয়ার অভ্যাস তার। বিড়ালটির জন্য আলাদা ব্যবস্থা করলেন রওশন আরা। এরপর বাড়ির বাইরে কুকুরদের জন্য নির্ধারিত পাত্রে খাবার দিলেন।
রওশন আরার বাড়ির অদূরে রোকেয়া বেগমের বাড়ি। সেখানেও একটি খাবারের পাত্র রাখা। রওশন আরা সেখানে খাবার নিয়ে যেতেই একটি কুকুর শরীর দুলিয়ে লাফাতে লাগল। রওশন আরা মুচকি হেসে বললেন, ‘এই সেই বল্টু, একে নিয়েই যত গন্ডগোল!’