১০০ টাকায় ৬ কেজি আলু, হিসাব মেলাতে হিমশিম কৃষক
আলু চাষ করে গত মৌসুমে লোকসান গুনেছিলেন চন্দনাইশের কৃষক মো. হারুন। তাই এবার ঝুঁকি কমাতে জমি কমিয়েছেন। ২০ শতক জমিতে আলু লাগিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে প্রায় ৬০০ কেজি আলু তুলেছেন মাঠ থেকে। কিন্তু বিক্রি করতে গিয়ে দেখেছেন, হিসাব মিলছে না।
মো. হারুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতি কেজি আলু ১৮ টাকায় বিক্রি করেছি। অথচ উৎপাদন খরচ পড়েছে প্রায় ২০ টাকা। প্রতি কেজিতে দুই টাকা করে লোকসান। অর্থাৎ ৬০০ কেজি আলু বিক্রি করে লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা।’
চন্দনাইশে গত সোমবার ১০০ টাকায় ৬ কেজি আলু বিক্রি হয়েছে বলে জানান আরেক কৃষক উসমান গণী। তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে আলুর দাম উঠছে না। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে চট্টগ্রামে আলু আসে। উৎপাদনও বেশি। তাই বাজারে দর পড়ে যায়।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার শতাধিক কৃষক কয়েক বছর ধরে আলু চাষে লাভের মুখ দেখছেন না। ফলে অনেকে ধীরে ধীরে এ ফসল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
চট্টগ্রামে ডায়মন্ড (বারি-৭), কার্ডিনাল (বারি-৮) ও দোহাজারীর স্থানীয় জাতসহ কয়েক ধরনের আলু চাষ হয়। ডায়মন্ড ও কার্ডিনাল জাতের উৎপত্তি নেদারল্যান্ডসে। আর ‘দোহাজারী’ চট্টগ্রামের স্থানীয় জাত, বহু বছর ধরে এ অঞ্চলে এর চাষ হয়ে আসছে। সাধারণত নভেম্বরের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময়ে বীজ রোপণ করা হয়। ৯০ থেকে ৯৫ দিনের মধ্যে আলু তোলা যায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, দোহাজারী জাতের আলু তুলনামূলক ভালো দাম পেয়েছে। কিন্তু ডায়মন্ড ও কার্ডিনালের বাজারদর কম। গত বছরের আলু এখনো মজুত আছে। তার ওপর এবারও উৎপাদন হয়েছে। সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমছে। মো. ওমর ফারুক বলেন, অনেক কৃষক অপরিপক্ব বীজ ব্যবহার করছেন। এতে ফলন কমছে। জাতভেদে উৎপাদন খরচ পড়ছে ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি। বর্তমান বাজারদরে সেই খরচও উঠছে না।
আলু মাটির নিচে জন্মালেও রোগবালাইয়ের ঝুঁকি কম নয়। আনোয়ারার কৃষক প্রদীপ শিকদার বলেন, ‘রোগে অনেক আলু নষ্ট হচ্ছে। ওষুধ দিয়েও পুরোপুরি কাজ হচ্ছে না। ভালো মানের বীজ আর সার দরকার।’ পাতা কুঁকড়ে যাওয়া, গাছের বৃদ্ধি কমে যাওয়া—এসব সমস্যায় ফলন কমছে বলে জানান কৃষকেরা।
কমছে আবাদ ও উৎপাদন
চট্টগ্রামে রবি মৌসুম (১৫ অক্টোবর-১৫ মার্চ) আলু চাষের সময়। এ সময়ে বোরো ধান, শীতকালীন সবজি, ভুট্টা, গম, তেল ও ডালজাতীয় ফসলের পাশাপাশি নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে আলুর বীজ রোপণ করা হয়। তবে জেলায় আলুর আবাদ ধারাবাহিকভাবে কমছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে চট্টগ্রামে ৪ হাজার ৬৪১ হেক্টর জমিতে ৬৪ হাজার ৬৮৫ টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবাদ কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬৮৩ হেক্টরে, উৎপাদন নেমে এসেছে ৪৬ হাজার ৪৯৯ টনে। পাঁচ বছরে আবাদ কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ, উৎপাদন কমেছে প্রায় ২৮ শতাংশ।
অধিদপ্তরের দৈনিক অগ্রগতি প্রতিবেদন বলছে, চলতি রবি মৌসুমে এখন পর্যন্ত (গত সোমবার) ৩ হাজার ৩১৬ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ৩ হাজার ৭৫০ টন। মার্চ পর্যন্ত আলু তোলার সময় রয়েছে।
কয়েক মৌসুম ধরেই আলু চাষে ভরসা পাচ্ছেন না চন্দনাইশের কৃষক আবু ছৈয়দ। কোনো বছর খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হয়, আবার কোনো বছর সামান্য আয় হলেও তা দিয়ে লোকসানের ‘ঘা’ শুকায় না। তাই এবার কম জমিতে আলু চাষ করেছেন। আবু ছৈয়দ বলেন, ‘চার শতক জমিতে চাষ করে ১০০ কেজি আলু পেয়েছি। এবারও খরচ উঠে আসেনি। ফলে আগামী বছর অন্য ফসলের চাষ করব।’
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, আলুচাষিদের টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, বাজার ব্যবস্থাপনাও শক্ত করতে হবে। প্রথমত, মানসম্মত ও রোগমুক্ত বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, মাঠপর্যায়ে সমন্বিত রোগবালাই ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে, যাতে অকারণে কীটনাশকের খরচ না বাড়ে। এ ছাড়া সংরক্ষণব্যবস্থা বাড়ানো এবং সহজ শর্তে হিমাগার সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।