বইয়ের সঙ্গেই যাঁর নিত্যদিনের বসবাস, সংগ্রহে ১০–১২ হাজার বই

সোফায় বসে বই পড়ছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো.. শাজাহান। তাঁর সংগ্রহে ১০ থেকে ১২ হাজার বই আছে। গত মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার কাশিমপুর গ্রামেছবি: প্রথম আলো

একাত্তরে দেশের স্বাধীনতার জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শাজাহান। এরপর পাঁচ দশক পেরিয়ে গেছে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর। তবু অজ্ঞতা ও জ্ঞানহীনতার বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই থামেনি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বই-ই হয়ে উঠেছে তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। বইয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই নিজ বাড়িতে গড়ে তুলেছেন ১০ থেকে ১২ হাজার বইয়ের বিশাল সংগ্রহশালা।

বইপ্রেমী এই মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার কাশিমপুর গ্রামে। স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে ‘শাজাহান চুন্নু’ নামে চেনেন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইছামতীর তীরে তাঁর জন্ম। বাবা শফিউদ্দিন ছিলেন অফিস সহকারী। নবাবগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৭০ সালে এসএসসি, পরে সরকারি দোহার-নবাবগঞ্জ (ডিএন) কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। পরে ঢাকা কলেজ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও কোনো ডিগ্রি সম্পন্ন করেননি। পরে তিনি ঠিকাদারি ব্যবসায় যুক্ত হন।

আধা পাকা টিনের ঘরের প্রতিটি কক্ষেই বইয়ের স্তূপ। তাক বা আলমারিতে সব বই সাজিয়ে রাখার সুযোগ নেই। অনেক স্থানে এলোমেলো বইয়ে স্তূপ দেখে মনে হয় যেন অরক্ষিত পাঠশালা। তাকগুলোতে জায়গা করে নিয়েছে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি, দর্শন, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজবিষয়ক নানা বই।

দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় মো. শাজাহানের। নিজের উপার্জনের অর্থে একে একে বই কিনেছেন। সংগ্রহে থাকা অধিকাংশ বই-ই পড়েছেন তিনি। বাংলা বইয়ের পাশাপাশি ইংরেজি বই ও পত্রিকাও পড়েন নিয়মিত। ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি, দর্শন, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা বইয়ের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি লেখকদের বই আছে তাঁর সংগ্রহে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শাজাহানের সংগ্রহে থাকা বইয়ের একাংশ। গত মঙ্গলবার নবাবগঞ্জের কাশিমপুর গ্রামে তাঁর বাড়িতে
ছবি: প্রথম আলো

গত মঙ্গলবার বিকেলে কাশিমপুর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বারান্দার সোফায় বসে দুটি নতুন বই দেখছেন শাজাহান। সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার ‘সংসদের দিনগুলি’ ও আলতাফ পারভেজের ‘পাকিস্তান আন্দোলন’ নামের বই দুটি অনলাইন থেকে সদ্য কিনেছেন। নতুন বই কেনা ও পড়া তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাসের অংশ। অবসর পেলেই বই হাতে তুলে নেন। নতুন বই সংগ্রহ করা, পুরোনো বই পড়া ও পছন্দের বই অন্যদের পড়তে দেওয়া নিয়েই তাঁর আনন্দ।

একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের জন্য তাঁর যে অবদান, বইপ্রেমী মানুষ হিসেবে তাঁর বর্তমান জীবন যেন সেই দায়িত্ববোধেরই আরেক রূপ। একসময় অস্ত্র হাতে দেশের জন্য লড়েছেন; এখন বইকে সঙ্গী করে অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়ছেন।
আবদুল মালেক শিকদার, কলেজশিক্ষক ও লেখক

আধা পাকা টিনের ঘরের প্রতিটি কক্ষেই বইয়ের স্তূপ। তাক বা আলমারিতে সব বই সাজিয়ে রাখার সুযোগ নেই। অনেক স্থানে এলোমেলো বইয়ে স্তূপ দেখে মনে হয় যেন অরক্ষিত পাঠশালা। তাকগুলোতে জায়গা করে নিয়েছে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি, দর্শন, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজবিষয়ক নানা বই।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শাজাহান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর সংগ্রহে ১০ থেকে ১২ হাজার দেশি ও বিদেশি বই আছে। সিংহ ভাগ বই পড়েছেন। তিনি নিয়মিত বাংলা পত্রিকার সঙ্গে ইংরেজি পত্রিকা পড়েন। মৃত্যুর পর তাঁর এই সংগ্রহ দুই নাতি আলিফ ও আহাদের জন্য রেখে যাবেন। এসব বই তিনি ৫৫ বছর ধরে নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে কিনে সংগ্রহ করেছেন।

আলমারি, বইয়ের তাকসহ ঘরের বিভিন্ন স্থানে রাখা হয়েছে দেশি–বিদেশি হাজারো বই। গত মঙ্গলবার বিকেলে নবাবগঞ্জ উপজেলার কাশিমপুর গ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহানের বাড়িতে
ছবি: প্রথম আলো

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, হুমায়ুন আজাদ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বুদ্ধদেব বসু ও ম্যাক্সিম গোর্কি তাঁর প্রিয় লেখকদের মধ্যে অন্যতম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের বইও আছে সংগ্রহে। অনেক কবিতা ও গল্প তাঁর মুখস্থ। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে নিজের প্রিয় মানুষদের একজন মনে করেন তিনি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সাঈদও তাঁর পছন্দের ব্যক্তিত্বদের একজন।

বই পড়ার আনন্দ নিজের মধ্যে আটকে রাখেন না মো. শাজাহান। পরিচিতজন, তরুণ প্রজন্ম ও বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতায় প্রায়ই বইয়ের প্রসঙ্গ তোলেন। ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতিসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। পছন্দের বই অন্যদের পড়তেও দেন। তাঁর বাড়িতে বই নিয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় অনেকের কাছে জ্ঞানচর্চার একটি জায়গা হয়ে উঠেছে।

শাজাহানের পরিচিত ফারুক মশিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি নিজের মধ্যে জ্ঞান আটকে রাখেন না। বই পড়ে যে জ্ঞান অর্জন করেন, তা আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চান। তাঁর বাড়িতে বই নিয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় হয়।

বই পড়ার আনন্দ নিজের মধ্যে আটকে রাখেন না মো. শাজাহান। পরিচিতজন, তরুণ প্রজন্ম ও বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতায় প্রায়ই বইয়ের প্রসঙ্গ তোলেন
ছবি: প্রথম আলো

কলেজশিক্ষক ও লেখক আবদুল মালেক শিকদার বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের জন্য তাঁর যে অবদান, বইপ্রেমী মানুষ হিসেবে তাঁর বর্তমান জীবন যেন সেই দায়িত্ববোধেরই আরেক রূপ। একসময় অস্ত্র হাতে দেশের জন্য লড়েছেন; এখন বইকে সঙ্গী করে অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়ছেন। তাঁর জ্ঞান আহরণের এ প্রচেষ্টা তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহিত করবে।