মেঘনার বুকে জন্ম, সেখানে সংসার, সেখানেই মৃত্যু

তাঁরা তিনজনই জাহানুর বিবির সন্তান। মেঘনার বুকে এই নৌকাতে তাঁদের জন্ম ও বসবাস। মঙ্গলবার ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ফেরিঘাট এলাকায়ছবি: তারেক আল হাসান

জাহানুর বিবি জানেন না তাঁর বয়স কত। শৈশবের স্মৃতি বলতে তাঁর আছে নৌকায় পাতা বাবা-মায়ের সংসার আর তাঁদের সঙ্গে মেঘনার জলের বুকে ভেসে থাকার বিরতিহীন যাত্রা। তাঁর জন্ম এই নৌকায়। অল্প বয়সে বিয়ের পর সংসার গড়েছেন আরেক নৌকায়। এখন হয়তো বয়স ৪০ বা কিছুটা বেশি। পুরো একটা জীবন তাঁর কেটে গেল এই জলের বুকে।

জাহানুর বিবির সঙ্গে দেখা হয় ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ফেরিঘাটের অদূরে মেঘনার তীরে। দুপুরের প্রখর রোদে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। একটু পরই মাছ ধরতে যাবেন নদীতে। তাঁর পরনের সুতির শাড়ির আঁচল হাতের মুঠিতে নিয়ে কিছু একটা আবদার করছিল একটি শিশু। আমার দিকে হেসে বললেন, ‘ও আমার মেয়ে, নাম কোহিনূর।’ শিশুটির চোখের মণি দুটি হীরার মতো। নামের প্রতি সুবিচার তার চাহনিতে।

আমাদের শহুরে কিংবা গ্রামীণ মানুষদের জীবনে উৎসব, আনন্দ কিংবা বেদনা পালনের যেমন সুযোগ থাকে—জাহানুর বিবিদের তা নেই। তাঁদের আছে কেবল সংগ্রাম আর টিকে থাকার লড়াই। মাছ ধরতে পারলে তা বেচে চুলায় হাঁড়ি চড়বে। ফলে রোদ-বৃষ্টির দোহাই নেই। আবার যতই ঝড় আসুক, এই নৌকায়, এই জলের বুকে তাঁদের ভেসে থাকতে হবে। এই পৃথিবীর বুকে সত্যিই কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তাঁদের।

যতই ঝড় আসুক, এই নৌকায়, মেঘনার এই জলের বুকে ভেসে থাকতে হয় জাহানুর বিবিদের পরিবারকে। মঙ্গলবার ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ফেরিঘাট এলাকায় মেঘনা নদীতে
ছবি: তারেক আল হাসান

ইলিশা ঘাট থেকে তিন কিলোমিটার দূরে রাজাপুর খাল। এটি মেঘনায় পড়েছে। ভাসমান এই জীবনের আশ্রয় হিসেবে এখন খালেই রাত যাপন করেন তাঁরা। সেখানে আছে আরও শ খানেক পরিবার। সবাই মানতা সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁরা মূলত জলযাযাবর। নিজেদের বেদে হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

জাহানুর বিবি বললেন, ‘আমাদের জাগা নাই, জমিন নাই। কী খাইয়া বাঁচমু? মাছ ধরা ছাড়া উপায় নাই। চাইর মেয়ে, এক ছেলে আমার। স্বামী–সন্তানদের নিয়া মাছ ধরি। এই ধরেন, হাতিয়া, রামগতি, মতিরহাট—এদিকেও চলে যাই মাছ ধরতে। আশপাশে ঘাট যেখানে পাই, সেখানে বেচে দিই।’

ঝড়ের মধ্যে স্ত্রী, বাচ্চাকাইচ্চা নিয়া মরি, না বাঁচি, আল্লায় রাখবে, না লইয়া যাইবে—এর ঠিক থাকে না। একখান ঘর হইলে খুব সুবিধা হয়।
মো. ইব্রাহিম, মেঘনা নদীতে নৌকায় বসবাস করা মানতা সম্প্রদায়ের মানুষ

মাছ ধরে যে টাকা পান তা দিয়ে সংসার চলে? এমন প্রশ্নের পর জাহানুর বিবির চোখে বিষাদ নেমে আসে। খানিকটা চুপ করে বললেন, ‘না...আরও দেনা থাকে। দোকানের দেনা, দাদনের দেনা...’

নদীতে যখন ঝড় ওঠে তখন নৌকা নিয়ে খালে ঢুকে পড়েন তাঁরা। কখনো কখনো হঠাৎ ঝড় ওঠে। তখন আসলে ফেরার উপায় থাকে না। তটস্থচিত্তে নৌকা তীরে এনে ঝড় থামার অপেক্ষায় থাকেন।

মানতাদের নৌকায় অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হয় শিশুরা। যেসব শিশুদের সাঁতার শেখার বয়স হয়নি, ২৪ ঘণ্টাই তাদের পা নৌকার সঙ্গে একটি দড়িতে বাঁধা থাকে। তা না হলে হামাগুড়ি দিয়ে বা কোনো কারণে নদীতে পড়ে গেলেই নিশ্চিত মৃত্যু। গহিন জলে লাশটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। অনেক বছর আগে জাহানুর বিবির একটি ছেলে এভাবে মেঘনায় পড়ে তলিয়ে গিয়েছিল।

মানতা সম্প্রদায়ের যেসব শিশুর সাঁতার শেখার বয়স হয়নি, ২৪ ঘণ্টাই তাদের পা নৌকার সঙ্গে একটি দড়িতে বেঁধে রাখা হয়। তা না হলে কোনো কারণে নদীতে পড়ে গেলেই নিশ্চিত মৃত্যু
ছবি: তারেক আল হাসান

মানতাদের এখন জাতীয় পরিচয়পত্র আছে। তাঁরা ভোটও দেন। তবে এর বাইরে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কোনো সুযোগ তাঁরা পান না। তাঁদের জেলে কার্ড নেই, ফলে সরকারের তরফে কোনো বরাদ্দের আওতায় তাঁরা পড়েন না।

জাহানুর বিবির সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, পাশে বসেছিলেন তাঁর স্বামী মো. ইব্রাহিম। বয়স একবার বললেন ৫০, আবার বললেন ৫৫। তাঁরও জন্ম এমন একটি নৌকায়। এতগুলো বছর ধরে জলযাযাবরের জীবন কাটিয়ে এখন তিনি ক্লান্ত। মাটির বুকে একটি ঘর পেতে চান তিনি। সরকারের গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের মতো কোনো একটাতে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেই চলবে। তিনি বললেন, ‘ঝড়ের মধ্যে স্ত্রী, বাচ্চাকাইচ্চা নিয়া মরি, না বাঁচি, আল্লায় রাখবে, না লইয়া যাইবে—এর ঠিক থাকে না। একখান ঘর হইলে খুব সুবিধা হয়।’