মা–বাবার বিচ্ছেদের পর স্বজনের কাছে বড় হন, দাফন হবে সরকারি কবরস্থানে

নীরব আহমেদছবি: সংগৃহীত

জীবনের বেশির ভাগ সময় মা–বাবার আশ্রয়ের বাইরে কাটিয়েছেন নীরব আহমেদ (২২)। শৈশবে মা-বাবার বিচ্ছেদের পর আত্মীয়ের বাড়িতে বড় হয়েছেন তিনি। ২২ বছর বয়সে মৃত্যুর পরও তাঁকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। জন্মদাতা বাবা ও সৎবাবার টানাপোড়েনের কারণে শেষ পর্যন্ত নিজ গ্রামে নয়, ঝিনাইদহ সরকারি কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

আক্ষেপ করে কথাগুলো বললেন নীরবের খালু ঝিনাইদহ শহরের বাসিন্দা আবুল কাশেম। যাঁর বাড়িতে জীবনের বড় একটি সময় কাটিয়েছেন নীরব।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, মাত্র সাত বছর বয়সে নীরব আহমেদের বাবা আলিমুর রহমানের সঙ্গে তাঁর মা মিলি বেগমের সংসার ভেঙে যায়। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বাদুরগাছা গ্রামে আলিমুর রহমানের বাড়ি। পরে মিলি বেগম একই গ্রামের হারুন অর রশীদকে বিয়ে করেন। এই বিয়ের পর থেকেই নীরব কার্যত আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন। এদিকে আলিমুর রহমানও পাশের ঝনঝনিয়া গ্রামের সাহিদা খাতুনকে বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করেন। বর্তমানে সাহিদা খাতুনের ঘরে তাঁর একটি মেয়ে আছে।

আরও পড়ুন

সাহিদা খাতুন বলেন, আনুমানিক দুই বছর নীরব তার মায়ের সঙ্গে সৎবাবার বাড়িতে ছিল। এরপর সেখান থেকে চলে যায় ঝিনাইদহ শহরে তার খালু আবুল কাশেমের বাড়িতে। সেখানেই বড় হয়েছে, পড়াশোনা করেছে। দীর্ঘ সময় ঝিনাইদহে থাকার কারণে গ্রামে তার আসা–যাওয়া কম ছিল। মাঝেমধ্যে গ্রামে এলেও বেশিক্ষণ থাকত না। কখনো মাকে, আবার কখনো বাবাকে দেখে ফিরে যেত শহরে।

সাহিদা খাতুন বলেন, প্রায় এক বছর আগে নীরব ঝিনাইদহের শৈলকুপায় বিয়ে করে। বৈশাখী আক্তার নামে এক তরুণীকে বিয়ে করলেও সেই সংসার টেকেনি। প্রায় সাত মাস পর তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর নীরব খালুর বাড়ি ছেড়ে শহরের একটি মেসে থাকতে শুরু করে। সেখানে থেকে সে একটি মোবাইল অপারেটর কোম্পানির সিম বিক্রির কাজ করত।

আজ রোববার নীরবের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সৎমা সাহিদা খাতুন তাঁর মেয়েকে নিয়ে বাড়িতে আছেন। আত্মীয়স্বজন ছিলেন না। বাড়িটির কেউ মারা গেছেন—এমন কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি।

প্রতিবেশীরা বলেন, নীরবের জীবনটা খুব কষ্টের ছিল। গত বছর রমজান মাসে তাঁর মা মিলি বেগম মারা যান। এরপর নীরবকে এলাকায় খুব একটা দেখা যায়নি। জীবনের বড় সময়ই তিনি ঝিনাইদহ শহরে কাটিয়েছেন। তবে মৃত্যুর খবর পেয়ে তাঁর বাবা ও সৎবাবা দুজনই হাসপাতালের মর্গে গেছেন।

ঝিনাইদহে নিহত নীরব আহমেদের লাশ নেওয়ার অপেক্ষায় মর্গে স্বজনেরা
ছবি:  প্রথম আলো

হাসপাতালের মর্গে গিয়ে কথা হয় সৎবাবা হারুন অর রশীদের সঙ্গে। তিনি বলেন, নীরব বলে গিয়েছিল তার মৃত্যুর পর মায়ের পাশে দাফন করতে। সে জন্য তিনি লাশ নিতে এসেছিলেন। কিন্তু তার জন্মদাতা বাবার আপত্তি আছে। এ জন্য তিনি লাশ নিতে পারলেন না।

তবে ওই সময় সেখানে আলিমুর রহমানকে পাওয়া যায়নি। তিনি মুঠোফোনে বলেন, ছেলের লাশ নিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু হাসপাতাল থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে তিনি ফিরে এসেছেন।

আরও পড়ুন

সেখানে উপস্থিত ছিলেন নীরবের খালু আবুল কাশেম। তিনি বলেন, দুজন লাশ নিয়ে টানাটানি করায় তিনি নিজে ঝিনাইদহ সরকারি কবরস্থানে দাফনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেভাবে উভয়কে জানিয়ে দিয়েছেন।

নীরব আহমেদ ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কমিটির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ছিলেন। গতকাল শনিবার রাতে শহরের টার্মিনাল এলাকার তাজ ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলে তেল নিতে গেলে কর্তৃপক্ষ তাঁকে তেল দিতে অস্বীকৃতি জানায় বলে জানা গেছে। এ নিয়ে কথা–কাটাকাটির এক পর্যায়ে পাম্পের কর্মচারীরা তাঁকে মারধর করেন। গুরুতর অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।