চট্টগ্রামের আনোয়ারায় মা-মেয়ে হত্যার পেছনে পাওনা টাকার বিরোধ রয়েছে বলে দাবি করেছেন নিহত এনি বড়ুয়ার (৪০) স্বামী ও প্রিয়ন্তী বড়ুয়ার (১৬) বাবা সুজন বড়ুয়া। তাঁর চাচাতো ভাই তেজ বড়ুয়া এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
আজ রোববার দুপুরে প্রথম আলোকে সুজন বড়ুয়া বলেন, তাঁর চাচাতো ভাই তেজ বড়ুয়াকে বিভিন্ন সময়ে তিনি ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা ধার দেন। এই টাকা ধার দিয়ে তিনি প্রমাণস্বরূপ স্ট্যাম্পে লিখে তেজ বড়ুয়ার সইও নিয়েছিলেন। পাওনা টাকার স্ট্যাম্প হাতিয়ে নিতেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন তেজ বড়ুয়া। মৃত্যুর আগে আহত অবস্থায় তাঁর স্ত্রীও তেজ বড়ুয়ার নাম বলে গেছেন বলে প্রতিবেশীদের কাছে শুনেছেন তিনি।
গতকাল শনিবার রাতে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় নিজ ঘর থেকে মা ও মেয়ের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চেনামতি বড়ুয়াপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এতে সুজন বড়ুয়ার স্ত্রী এনি বড়ুয়া ও তাঁর মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়া নিহত হন। ওই ঘটনায় আহত আছে সুজনের পাঁচ বছরের ছেলে পিয়াস বড়ুয়াও।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গতকাল দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে হঠাৎ সুজন বড়ুয়ার ঘর থেকে চিৎকার শুনতে পান প্রতিবেশীরা। এরপর তাঁরা এগিয়ে গিয়ে দেখেন রক্তাক্ত অবস্থায় পাঁচ বছরের ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছেন এনি বড়ুয়া। দরজা খুলে বের হতেই মাটিতে ঢলে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়। প্রতিবেশীরা ঘরে ঢুকে দেখেন ভেতরে এনি বড়ুয়ার কিশোরী মেয়ে প্রিয়ন্তীর রক্তাক্ত লাশ পড়ে রয়েছে। প্রতিবেশীরা আহত অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। একই সঙ্গে পুলিশকেও খবর দেওয়া হয়।
ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং নিহত প্রিয়ন্তী বড়ুয়ার সহপাঠীরা একে একে জড়ো হয়ে বিচার দাবি করেন। এনি বড়ুয়ার স্বামী সুজন বড়ুয়া বলেন, তিনি চট্টগ্রাম নগরে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে চাকরি করেন। ঘটনার সময় তিনি কর্মস্থলে ছিলেন। স্বজনদের ফোন পেয়ে বাড়িতে এসে স্ত্রী-কন্যার লাশ দেখতে পেয়েছেন। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।
এদিকে ঘটনার পর পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। সকালে লাশ দুটির সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায় পুলিশ। জানতে চাইলে আনোয়ারা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) মাহমুদুল হাসান বলেন, নিহত ব্যক্তিদের শরীরের একাধিক স্থানে ধারালো অস্ত্রের জখম রয়েছে। এ ছাড়া শিশুটির শরীরে জখম থাকলেও সে এখন শঙ্কামুক্ত। তিনি আরও বলেন, ‘মা-মেয়েকে হত্যার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আশা করি, দ্রুত ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন হবে।’
জানতে চাইলে সুজন বড়ুয়া বলেন, ‘আমি গতকাল সকালে ঘর থেকে চলে যাই। রাত পৌনে ১১টার সময় ঘরে ফোন করলে কেউ ফোন ধরেনি। ওই সময় পাশের ঘর থেকে ফোনে শুধু জানানো হয় স্ত্রী সন্তানের ওপর হামলার কথা। সঙ্গে সঙ্গে আমি চট্টগ্রাম শহর থেকে চলে আসি। ঘরে এসে দেখি দুজনের লাশ।’
সুজন বড়ুয়া আরও বলেন, ‘মারা যাওয়ার আগে আমার স্ত্রী তেজ বড়ুয়ার নাম বলে গেছে। এই ভিডিও প্রতিবেশীদের কাছে আছে। তেজের সঙ্গে আমার শত্রুতা ছিল না। তিনি বেকার থাকায় গাড়ি কেনার জন্য আমার কাছ থেকে বিভিন্ন সময় টাকা নেন। এসব টাকার বিপরীতে আমি স্ট্যাম্প নেই। হয়তো এসব স্ট্যাম্প হাতিয়ে নিতে গিয়ে ঘরে আমার স্ত্রী সন্তানকে খুন করেছেন তিনি।’
ঘটনার পর থেকে তেজ বড়ুয়া এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছেন। তাঁর মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। এ কারণে অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সুজন বড়ুয়ার বড় ভাই রঞ্জন বড়ুয়া বলেন, ‘আমি টেলিফোনে খবর পেয়ে রাত দুইটার সময় ঘরে আসি। ঘরে এসে শুনতে পাই তেজ বড়ুয়া আমার ভাইয়ের বউ ও তার মেয়েকে মেরে ফেলেছে। মারা যাওয়ার আগে এনি বড়ুয়া এমন বক্তব্য দিয়েছে বলে আমরা শুনেছি। আমরা এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করি।’
আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জুনায়েত চৌধুরী বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা পাওনা টাকা নিয়ে সুজন বড়ুয়ার সঙ্গে তেজ বড়ুয়ার বিরোধের বিষয়টি সামনে এনে তদন্ত শুরু করেছি। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন।’