নোয়াখালীতে কেন ‘মাদক ব্যবসার’ অভিযোগ এনে মারধর ও বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটছে
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার নদনা ইউনিয়নের উত্তর শাকতলা গ্রাম। গত বৃহস্পতিবার রাতে ওই গ্রামের বাসিন্দা মো. ফয়েজকে (৩৭) বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যান একই এলাকার একদল লোক। তাঁরা ওই ব্যক্তিকে মারধরের পর মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁর ঘরের পাশে রেখে চলে যান। পরে পরিবারের লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত ফয়েজের বাবা মো. জামাল অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে ‘মাদক ব্যবসায়ী’ আখ্যা দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। তিনি এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান। এ ঘটনায় নিহত ফয়েজের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে শুক্রবার রাতে একটি হত্যা মামলা করা হয়। পুলিশ হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে।
বৃহস্পতিবার রাতের এই হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। নোয়াখালী জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ‘মাদক ব্যবসার’ সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ এনে একাধিক ব্যক্তিকে মারধর ও বাড়িঘরে হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর বেগমগঞ্জ উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের মুজাহিদপুর গ্রামের মো. বদি নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে হামলা চালান মুসল্লিরা। বদির বিরুদ্ধেও অভিযোগ মাদক ব্যবসার। হামলার সময় স্থানীয় কিছু মানুষ বাড়িঘর না ভাঙার অনুরোধ করেন হামলাকারীদের। হামলাকারীরা সে কথা শোনেননি। তাঁরা বসতঘরের টিনের বেড়া এবং বাড়ির সীমানাপ্রাচীর ভাঙচুর করেন। তবে ওই ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা জানা যায়নি।
একই দিন রাতে জেলার কবিরহাট উপজেলার ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের চিরিঙ্গা বাজারেও মারধরের ঘটনা ঘটে। ‘মাদক বিক্রির’ অভিযোগে দেলোয়ার হোসেন, মো. করিম ও আলাউদ্দিন নামের তিন ব্যক্তিকে আটক করে পিটুনি দেন স্থানীয় মানুষজন। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, বয়স্ক এক ব্যক্তিকে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে চেপে ধরে পেটানো হচ্ছে।
সেনবাগের এ ঘটনা নিয়ে ফেসবুকে বিভিন্নজন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। ক্ষোভের সঞ্চার হয় জেলার সাধারণ মানুষের মধ্যেও। এরপরই জেলার বিভিন্ন স্থানে ‘মাদক ব্যবসায়ীদের’ চিহ্নিত করে মারধর ও বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটতে থাকে। এর মধ্যে সোনাইমুড়ী, বেগমগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলায় মারধর এবং বাড়িতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। মারধরের ঘটনায় সোনাইমুড়ী উপজেলায় একজনের মৃত্যুও হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুলিশের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় জেলায় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ‘মব’ তৈরি করে আক্রমণেরও প্রবণতাও বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্কুলছাত্র হত্যার ঘটনায় ক্ষোভ থেকেই হামলা
নোয়াখালীর বিভিন্ন স্থানে এসব হামলার পেছনে গত বুধবার সেনবাগে এক স্কুলছাত্রের হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট লোকজন বলছেন। গত বুধবার রাতে জেলার সেনবাগ উপজেলার নবীপুর ইউনিয়নের দেবিসিংপুর গ্রামের সোমবাইরয়া বাজার এলাকায় ‘মাদক ব্যবসায়ীদের’ হামলায় আরাফাত হোসেন (১৫) নামের দশম শ্রেণির ছাত্র নিহত হয়। স্থানীয় লোকজন জানান, এলাকার চিহ্নিত ‘মাদক ব্যবসায়ীরা’ আরাফাতের নানাবাড়ির উঠান ও চলাচলের পথ ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা করে আসছিল। বাড়ির পাশেই বসানো হতো মাদকের আসর। আরাফাত ও তাঁর স্বজনেরা মাদক সেবন নিয়ে প্রতিবাদ করলে মাদকসেবীরা সংঘবদ্ধ হয়ে আরাফাতের নানার বাড়িতে হামলা চালান। তাঁরা আরাফতসহ তিনজনকে কুপিয়ে আহত করেন। পরে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পর আরাফাতের মৃত্যু হয়।
আরাফাতের নিহত হওয়ার রাতেই ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত মো. হারুনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে হারুনসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করে থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়। মামলার বাকি আসামিদের কেউ এখনো গ্রেপ্তার হয়নি বলে জানা গেছে। নিহত স্কুলছাত্র আরাফাত বেগমগঞ্জ উপজেলার পৌর হাজীপুর উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিল।
সেনবাগের এ ঘটনা নিয়ে ফেসবুকে বিভিন্নজন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। ক্ষোভের সঞ্চার হয় জেলার সাধারণ মানুষের মধ্যেও। এরপরই জেলার বিভিন্ন স্থানে ‘মাদক ব্যবসায়ীদের’ চিহ্নিত করে মারধর ও বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটতে থাকে। এর মধ্যে সোনাইমুড়ী, বেগমগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলায় মারধর এবং বাড়িতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। মারধরের ঘটনায় সোনাইমুড়ী উপজেলায় একজনের মৃত্যুও হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুলিশের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় জেলায় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ‘মব’ তৈরি করে আক্রমণেরও প্রবণতাও বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ধরনের ঘটনায় তরুণ ও যুবসমাজের মধ্যে বেপরোয়া ভাব প্রকাশ পাচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীরা অবশ্যই সমাজের চোখে, আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী। তাই বলে আইন হাতে তুলে নিয়ে তাঁদের মারধর করা কিংবা বাড়িঘরে হামলা চালানো ও হত্যা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এটি আইনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের শামিল। সমাজের সচেতন মানুষ আইন হাতে তুলে না নিয়ে আইন প্রয়োগে পুলিশকে সহায়তা করাই উত্তম। সে ক্ষেত্রে পুলিশ অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু নাছের মঞ্জু। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনায় তরুণ ও যুবসমাজের মধ্যে বেপরোয়া ভাব প্রকাশ পাচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীরা অবশ্যই সমাজের চোখে, আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী। তাই বলে আইন হাতে তুলে নিয়ে তাঁদের মারধর করা কিংবা বাড়িঘরে হামলা চালানো ও হত্যা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এটি আইনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের শামিল। সমাজের সচেতন মানুষ আইন হাতে তুলে না নিয়ে আইন প্রয়োগে পুলিশকে সহায়তা করাই উত্তম। সে ক্ষেত্রে পুলিশ অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
এ বিষয়ে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, জেলার বিভিন্ন স্থানে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মানুষজনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশের বিষয়টি সম্পর্কে তাঁরা অবগত রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে জেলার প্রতিটি থানার পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী কিংবা মাদকসেবী থাকলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। কেউ যাতে আইন হাতে তুলে না নিয়ে কোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে না পারে, সে ব্যাপারেও পুলিশ সজাগ আছে।
এক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন বলেন, সেনবাগে মাদক ব্যবসায়ীদের হামলায় স্কুলছাত্রের মৃত্যু ও সোনাইমুড়ীতে মাদক ব্যবসার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগ পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। যে ঘটনায় যারাই অপরাধী হোক, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।