চট্টগ্রামে বিএনপির ১৫ প্রার্থীর ১৩২ মামলা বিচারাধীন

প্রতীকী ছবি

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরী জাতীয় নির্বাচনে প্রথমবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন ২০০৮ সালে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সময় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। তবে এর পর থেকে একের পর এক মামলা হতে থাকে তাঁর বিরুদ্ধে। মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩২টিতে। বর্তমানে ৮০টি মামলা বিচারাধীন। অব্যাহতি ও খালাস পেয়েছেন ৫২ মামলা থেকে।

শুধু আসলাম চৌধুরী নন, চট্টগ্রামে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া বিএনপির অধিকাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হয়েছিল। বেশির ভাগ মামলা করা হয়েছিল ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।

এবার চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে ১৭ জনকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। তাঁদের মধ্যে চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-ডবলমুরিং-পাহাড়তলী) আসনের প্রার্থী বিএনপির প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে সাঈদ আল নোমান ও চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনের প্রার্থী দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা ছাড়া অন্য ১৫ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে মামলা হয়েছিল। সব মিলিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল ৩৭১টি। অবশ্য এখন পর্যন্ত ২১৪টি মামলা থেকে অব্যাহতি পান তাঁরা। এখনো বিচারাধীন ১৩২টি। অন্যগুলো স্থগিত রয়েছে।

এই সময়ে ‘গায়েবি মামলা’ নামের শব্দবন্ধও আলোচিত হয়েছিল। এ ধরনের মামলায় বিএনপিসহ বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের আসামি করা হয়েছিল। বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন, বিস্ফোরক দ্রব্য, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন (আইসিটি), সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ বিভিন্ন মামলায় আসামি করা হয়েছিল।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনে হলফনামা জমা দিয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। তাঁদের হলফনামা যাচাই করে মামলার সংখ্যা পাওয়া গেছে। হলফনামায় বিদ্যমান এবং অতীতে হওয়া মামলার কথা উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করেছিল আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতৃত্বাধীন মহাজোট। বিরোধী দল হয়েছিল বিএনপি। এরপর অনুষ্ঠিত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে জিতেছিল আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। টানা এই সময়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়েছিল। এর জের এখনো টানছেন তাঁরা।

এই সময়ে ‘গায়েবি মামলা’ নামের শব্দবন্ধও আলোচিত হয়েছিল। এ ধরনের মামলায় বিএনপিসহ বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের আসামি করা হয়েছিল। বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন, বিস্ফোরক দ্রব্য, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন (আইসিটি), সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ বিভিন্ন মামলায় আসামি করা হয়েছিল।

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা, বানোয়াট, গায়েবি মামলা দেওয়া হয়েছিল। এসব মামলায় অনেকে দিনের পর দিন কারাগারে থাকেন। অনেককে গ্রেপ্তার আতঙ্কে পরিবার-পরিজন ছেড়ে বাইরে রাত কাটাতে হয়েছিল। তিনি নিজেও ৪০টির বেশি মামলার আসামি হয়েছিলেন। তবে স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর যাচাই-বাছাই করে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া অনেক মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, প্রার্থী ও সাবেক আহ্বায়ক, দক্ষিণ জেলা বিএনপি

বিএনপির ১৭ প্রার্থীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে। তিনি ২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর কারাগার থেকে মুক্তি পান। এরপর বেশি ৪২টি মামলা হয় চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনের প্রার্থী ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানের নামে। ইতিমধ্যে ৪১টি মামলা থেকে খালাস ও অব্যাহতি পেয়েছেন এই বিএনপি নেতা।

চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনের বিএনপির প্রার্থী ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে ৩৮টি মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে অব্যাহতি পেয়েছেন ১৯টি থেকে। বাকি ১৯টি বিচারাধীন।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় বিভিন্ন মামলায় কারাগারে থাকতে হয়েছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে। তিনি চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা-ইপিজেড) আসনে প্রার্থী হয়েছেন। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সময় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ছিল ১৪টি। তবে আওয়ামী লীগের আমলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫টিতে। অবশ্য রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৩৪টি থেকে খালাস, প্রত্যাহার ও অব্যাহতি পেয়েছেন। এখনো একটি মামলা চলমান।

চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হয়েছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ এনামুল হক। তাঁর বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছিল ৩২টি। এখন পর্যন্ত অব্যাহতি পেয়েছেন ১১টি মামলা থেকে। বাকি ২১টি চলমান।

চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে এবার বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন সরোয়ার আলমগীর। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার আলমগীরের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল ২৭টি। পাঁচটি থেকে খালাস পেয়েছেন। বাকি ২২টি মামলার মধ্যে ১২টি স্থগিত আছে।

চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে দুজনকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। তাঁদের একজন কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান (স্থগিত) গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক গোলাম আকবর খন্দকার। এ দুই প্রার্থীর মধ্যে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল ২২টি। ১৭টিতে অব্যাহতি পেলেও এখনো ৫টি মামলা রয়ে গেছে। তবে এ মামলাগুলোতে তিনি জামিনে আছেন। গোলাম আকবর খন্দকার সাতটি মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন।

চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনে বিএনপির প্রার্থী জসীম উদ্দিন আহমেদ তাঁর বিরুদ্ধে করা ১১টি মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন ৫টিতে। চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের বিএনপির প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমীন সাতটি মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন।

চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা থাকলেও ইতিমধ্যে পাঁচটি থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন।

চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী-বায়েজিদ বোস্তামী) আসনের প্রার্থী বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন চারটি, চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী চারটি, চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে হুম্মাম কাদের চৌধুরী দুটি এবং চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সরওয়ার জামাল নিজাম একটি মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন।

চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনের সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা এবারের হলফনামায় মামলার সংখ্যা উল্লেখ করেননি। তবে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় ১০টি মামলার কথা উল্লেখ করেছিলেন। অবশ্য এসব মামলা থেকে আগেই অব্যাহতি পেয়েছিলেন তিনি।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও প্রার্থী মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান প্রথম আলোকে বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা, বানোয়াট, গায়েবি মামলা দেওয়া হয়েছিল। এসব মামলায় অনেকে দিনের পর দিন কারাগারে থাকেন। অনেককে গ্রেপ্তার আতঙ্কে পরিবার-পরিজন ছেড়ে বাইরে রাত কাটাতে হয়েছিল। তিনি নিজেও ৪০টির বেশি মামলার আসামি হয়েছিলেন। তবে স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর যাচাই-বাছাই করে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া অনেক মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। বাকিগুলোও প্রত্যাহার করা হবে বলে তিনি আশাবাদী।