অর্ধেকের বেশি সড়ক কাঁচা ও খানাখন্দে ভরা, ভোগান্তিতে নগরবাসী

রংপুর নগরের কেল্লাবন্দ থেকে উত্তম বানিয়াপাড়া সড়কের বেহাল দশা। সম্প্রতি নগরের উত্তম বানিয়াপাড়া এলাকা থেকে তোলাছবি: মঈনুল ইসলাম

রংপুর সিটি করপোরেশনের অর্ধেকের বেশি সড়ক কাঁচা ও খানাখন্দে ভরা। সিটি করপোরেশনের ১৮টি ওয়ার্ডে এখনো গ্রামীণ অবস্থা বিরাজ করছে। অধিকাংশ রাস্তাঘাট মাটির ও সরু। জুলাইয়ে অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে মেয়র ও কাউন্সিলরদের অপসারণের পর সিটি করপোরেশনের উন্নয়নকাজ থমকে আছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী।

১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত রংপুর পৌরসভার আয়তন ছিল ৫০ দশমিক ৬৬ বর্গকিলোমিটার। ২০১২ সালে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার পর আরও সাতটি ইউনিয়ন এতে যুক্ত করা হয়। ২০৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সিটি করপোরেশনে ওয়ার্ড ৩৩টি। মোট ১ হাজার ৪২৮ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে কাঁচা ৯৬৫ কিলোমিটার, পাকা ও এইচবিবি সড়ক ৪৬৩ কিলোমিটার।

সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠার ১৩ বছর পরেও সিটি করপোরেশনের প্রায় ৫০৫ কিলোমিটার সড়ক এখনো কাঁচা। এর বাইরে প্রায় ৩৪০ কিলোমিটার সড়ক মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশস্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রায় ২৫০ কিলোমিটার আরসিসি নালা ও ছোট–বড় প্রায় ৩০টি সেতু নির্মাণ করা দরকার।

রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আশরাফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, গত ২১ সেপ্টেম্বর তিনি প্রশাসক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে প্রতিটি সড়কের অবস্থা খারাপ দেখেছেন। এসব সড়ক নির্মাণ ও মেরামতে পাঁচ থেকে সাত হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সড়ক, নালা ও সেতু–কালভার্ট নির্মাণে ১ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। প্রাথমিকভাবে যেগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ, সেগুলো ঠিক করার জন্য ২১০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্পও একনেকের তালিকায় আছে। এখন একনেকের বৈঠক না থাকায় নির্বাচন–পরবর্তী সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

নগরবাসী বলছেন, সিটি করপোরেশনের ১৩ বছর পার হয়েছে। মূল শহর ও আশপাশে কিছু রাস্তা হলেও গোটা শহরে তেমন উন্নয়ন হয়নি। সিটির বর্ধিত ১৮টি ওয়ার্ডের অধিকাংশ রাস্তাঘাট মাটির হওয়ায় বর্ষাকালে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)–এর রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি ফখরুল আনাম প্রথম আলোকে বলেন, জনপ্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিলেও সাধারণ মানুষের মতামত নিয়ে কেউ কাজ করেননি। সিটি করপোরেশনের উন্নয়নমূলক কাজে সমন্বয়হীনতা লক্ষণীয়। জরুরিভাবে কোনো উদ্যোগ না নিলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে এ শহর চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়বে।

নগরের জাহাজ কোম্পানি থেকে সাতমাথা সড়ক দিয়ে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার একাংশের মানুষ চলাচল করেন। বিভাগীয় শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি দেড় বছর ধরে খানাখন্দে ভরা। এ নিয়ে একাধিকবার মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। গত জুলাইয়ে সিটি করপোরেশনকে ‘মৃত’ ঘোষণা করে প্রতীকী জানাজার নামাজ পড়া হয়।

সাতমাথার বাসিন্দা ও আন্দোলনকারী মুহম্মদ রাজিমুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা আন্দোলন করার পর সিটি করপোরেশন নড়েচড়ে বসেছিল। কিছু ইট ও খোয়া বিছিয়ে দিয়েছিল। এরপর সড়কটি সংস্কারের উদ্যোগের কথা শোনা গেলও এখনো কাজ শুরু হয়নি।’

সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আজম আলী বলেন, স্থানীয় সরকারের কোভিড–১৯ রেসপন্স অ্যান্ড রিকভারি প্রজেক্টের আওতায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয় ধরে সড়কটি সংস্কারে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এখন দরপত্র মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

সিটি করপোরেশনের কেল্লাবন্দ থেকে বানিয়াপাড়া, বসুনিয়াপাড়া, উত্তম পূর্বপাড়া হয়ে কদমতলা, সুকান চকি, মনোহর, হরিরাম পিরোজ, অভিরাম, গোয়ালু এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তাগুলো খানাখন্দে ভরা। উত্তম বানিয়াপাড়ার বাসিন্দা আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘অটোরিকশায় গেলে হেলেদুলে যায়। অসুস্থ লোকজন চলাচলে কষ্ট পায়। বৃষ্টি হলে পানি জমে থাকে। রিকশাচালক ভাড়া বেশি চায়।’

৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আশেক আলী প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সিও বাজার থেকে বানিয়াপাড়ায় জরুরি ভিত্তিতে অ্যাম্বুলেন্স নেওয়ারও অবস্থা নেই। তাঁরা স্থানীয়ভাবে কিছু জায়গায় মাটি দিয়ে কোনোরকমে চলার উপযোগী করেছেন।

সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, ২০১৫–১৬ অর্থবছরে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনের রাস্তা উন্নয়ন ও ড্রেন কাম ফুটপাত নির্মাণ ও ২০১৮–১৯ থেকে ২০২১–২২ অর্থবছর পর্যন্ত ২১০ কোটি টাকা ব্যয়ে সিটি করপোরেশনের জলাবদ্ধতা নিরসন ও অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। তবে ২০২৪–২৫ ও ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিবি) রংপুর সিটি করপোরেশনের কোনো বরাদ্দ ছিল না।

রংপুর সিটির সাবেক মেয়র ও জাতীয় পার্টির কো–চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান প্রথম আলোকে বলেন, রংপুর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে বিগত প্রধানমন্ত্রী বৈষম্যমূলক আচরণ করেছেন। যেখানে রংপুর সিটি করপোরেশনের আয়তনের তিন ভাগের এক ভাগ (প্রকৃতপক্ষে ৯৬ দশমিক ৭২ বর্গকিলোমিটার) রাজশাহী সিটি করপোরেশনে পাঁচ বছরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৬ হাজার কোটি টাকা, অথচ রংপুর পেয়েছিল ২১০ কোটি টাকা। এরপরও জাইকা, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে কিছু কাজ করা হয়। কিন্তু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় সিটি করপোরেশনের উন্নয়নকাজ থমকে আছে।