নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও বরিশালে প্রতিদিন ৪ কোটি টাকার ইলিশ বেচাকেনা
বরিশালের মেঘনা নদীতে একদিকে চলছে মা ইলিশ রক্ষায় অভিযান, অন্যদিকে দুর্গম চর ও মোহনায় দিনরাত চলছে ইলিশ শিকার। ছোট-বড় ইঞ্জিনচালিত অসংখ্য ট্রলার ও নৌকা নিয়ে জেলেরা ইলিশ ধরছেন। নদীর তীরের কয়েকটি ঘাটে নিলামে বিক্রি হচ্ছে এসব মাছ। পরে স্পিডবোট ও ট্রলারে করে তা চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়।
স্থানীয় জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, বরিশালের হিজলার আটটি ঘাটে প্রতিদিন সাড়ে তিন থেকে চার কোটি টাকার ইলিশ কেনাবেচা হচ্ছে। তাঁদের ভাষ্য, হিজলাকে কেন্দ্র করে মেঘনার এই অংশে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মা ইলিশ শিকার, কেনাবেচা ও পাচারের একটি বড় চক্র সক্রিয়।
গত বুধবার সকালে হিজলার বাউশিয়া লঞ্চঘাট, পুরোনো হিজলা নদীর পাড়, দুর্গাপুর, হরিনাথপুর ও আবুপুর এলাকায় গিয়ে অস্থায়ীভাবে বসানো কয়েকটি হাটে ইলিশ বিক্রি হতে দেখা যায়।
অভিযানে হামলা
৮ অক্টোবর থেকে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে। হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার মেঘনা ও এর শাখা নদ-নদী দেশের গুরুত্বপূর্ণ ইলিশ অভয়াশ্রমগুলোর একটি। কিন্তু ইলিশ রক্ষায় অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত দুই দফা হামলার ঘটনা ঘটেছে।
অভিযানের দ্বিতীয় দিন হিজলা-গৌরবদী ইউনিয়নের ওরাকল বাজারের ৭ নম্বর ঘাটসংলগ্ন মেঘনা নদীতে কোস্টগার্ড অভিযানে গেলে হিজলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানসহ দলের সদস্যরা হামলার শিকার হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্টগার্ড সদস্যরা ১১টি ফাঁকা গুলি ছোড়েন। গত বৃহস্পতিবার অভিযানকারী আরেকটি দলের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় জেলেদের ছোড়া ইটের আঘাতে দলের সঙ্গে থাকা এক শ্রমিক মাথায় গুরুতর আঘাত পান।
জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, মেঘনার জানপুর, খালিশপুর ও চরকিল্লা অবৈধ ইলিশ শিকার ও বিক্রির মূল কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া হিজলার হরিনাথপুর ইউনিয়নের আবুপুর সড়কের মোড়ে ছোট নৌকায় ধরা ইলিশের অস্থায়ী হাট বসে। এসব এলাকা দুর্গম এবং কয়েকটি জেলার মোহনা হওয়ায় একক কোনো জেলার প্রশাসন অভিযানে গেলে সীমানাজটিলতায় পড়ে। এই সুযোগে অন্তত দুই হাজার জেলে বড় ট্রলার নিয়ে দিনরাত ইলিশ ধরছেন বলে তাঁদের দাবি।
প্রতিটি ট্রলারে ২০ থেকে ৩০ জন জেলে থাকেন। অভিযানকারী দল এড়াতে অনেক ট্রলারে দুই-তিনটি ইঞ্জিন লাগানো হয়েছে। জেলেদের কাছে এগুলো ‘ফাইটার’ নামে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সংঘবদ্ধ জেলেরা অভিযানকারী দল দেখে সহজে পালান না; বরং ইট-পাথর, বাঁশ, লাঠি ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা করেন। লাঠির মাথায় কাপড় পেঁচিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুনের গোলা বানিয়ে ছোড়ার অভিযোগও রয়েছে।
জানপুর ও আবুপুরের ছয় জেলে বলেন, আশুলি আবুপুর, আবুপুর ও হরিনাথপুর এলাকার মেঘনার শাখা নদীতেও কয়েক শ ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ইলিশ ধরা হচ্ছে। এসব নৌকায় দুটি করে ইঞ্জিন বসানো হয়েছে। তাঁদের হিসাবে, ছোট নৌকায় প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা এবং বড় ট্রলারে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার ইলিশ ধরা পড়ে।
জানপুর-খালিশপুর-আবুপুরে ইলিশের হাট
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বরিশাল সদর উপজেলার কালাবদর নদের হবিনগর থেকে মেহেন্দীগঞ্জের বামনীরচর পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার, মেহেন্দীগঞ্জের গজারিয়া নদীর হাট থেকে হিজলা লঞ্চঘাট পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার এবং হিজলার মৌলভীর হাট থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম জাঙ্গালিয়া পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার এলাকা ইলিশের অভয়াশ্রম। ২০১৯ সালে এটি দেশের ষষ্ঠ ইলিশ অভয়াশ্রম হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়।
জেলেদের দাবি, ইলিশের অভয়াশ্রমের বড় অংশে শিকারের নিয়ন্ত্রণ হিজলা থেকে হচ্ছে। জানপুরে অন্তত ২০টি মাছঘাট আছে।
এই তিন এলাকার ঘাট-নিয়ন্ত্রকদের এক প্রতিনিধি বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় এসব ঘাটে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার ইলিশ বেচাকেনা হয়। এ ছাড়া আবুপুরের অস্থায়ী বাজারে বিক্রি হয় আরও ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার ইলিশ। শরীয়তপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকার অন্তত ২৫০ পাইকার সেখানে অবস্থান করেন। ঘাটে মাছ বিক্রিতে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয় বলেও তিনি জানান।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ
স্থানীয় জেলে, মাছ ব্যবসায়ী ও বিএনপির কয়েকজন নেতার ভাষ্য, আগে এসব ঘাট নিয়ন্ত্রণ করতেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও হিজলা-গৌরবদী ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিয়ন্ত্রণ যায় উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল গাফফার তালুকদারের হাতে। গত বছর তিনি মারা যাওয়ার পর ঘাটগুলোর নিয়ন্ত্রণ যায় যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন ওরফে খোকন দপ্তরি, সদস্যসচিব দেওয়ান মনির হোসেন ও গাফফার তালুকদারের দুই ছেলের হাতে।
তাঁদের দাবি, জানপুর, খালিশপুর ও চরকিল্লায় দেওয়ান মনিরের দুটি, আলতাফ হোসেনের তিনটি ও গাফফার তালুকদারের দুই ছেলের দুটি ঘাটে ইলিশ কেনাবেচা হয়। আবুপুরের ঘাটের নিয়ন্ত্রণ বরিশাল জেলা যুবদলের এক নেতা এবং হরিনাথপুর ইউনিয়ন বিএনপির এক শীর্ষ নেতার হাতে বলেও তাঁরা জানান।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেন আলতাফ হোসেন ও দেওয়ান মনির। আলতাফ বলেন, তিনি বিএনপির রাজনীতি করেন, তবে ইলিশ শিকারের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা নেই। তাঁর ঘাট নিষেধাজ্ঞার আগেই বন্ধ করা হয়েছে। জেলেরা প্রশাসনের সঙ্গে বেপরোয়া আচরণ করেন। প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে তাঁর দাবি।
দেওয়ান মনির বলেন, তাঁর ঘাটও নিষেধাজ্ঞার আগে বন্ধ হয়েছে। তাঁরা প্রশাসনকে সহায়তা করছেন।
জনবল ও অর্থসংকটে ব্যাহত অভিযান
হিজলা উপজেলা মৎস্য বিভাগের একটি সূত্র জানায়, এত বড় এলাকায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে বরাদ্দ মাত্র দেড় লাখ টাকা। এই অর্থ দিয়ে তিন-চার দিনের বেশি অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এতে শুরুতে অভিযান জোরালো থাকলেও পরে তা থমকে যায়।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বরাদ্দসংকটের কথা স্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিদিনই তাঁরা অভিযান পরিচালনা করছেন। কিন্তু বিপুলসংখ্যক জেলে ও বড় ট্রলারের তুলনায় অভিযান পরিচালনার জন্য তাঁদের প্রয়োজনীয় জনবল নেই।
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক মো. আনিসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, একটি বড় চক্র অবৈধভাবে ইলিশ শিকার করছে। কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশের সহায়তায় অভিযান চলছে। তবে জনবল কম, এলাকাও দুর্গম। জেলেরা বেপরোয়া হওয়ায় ভয়ে রাতে অভিযান চালানো কঠিন। নৌবাহিনীকে যুক্ত করতে না পারলে চক্রটিকে ঠেকানো কঠিন হবে বলে তিনি মনে করেন।