সাগরে ভাসতে থাকা ‘বিশালাকার’ ধাতব কাঠামো তীরে টেনে আনলেন জেলেরা, মানুষের কৌতূহল
দেখতে অনেকটা তেলবাহী ট্রেনের ট্যাংকের মতো। ধাতব কাঠামোটি ভাসছিল বঙ্গোপসাগরের সন্দ্বীপ চ্যানেলে। হঠাৎ লাল রঙের কাঠামোটি চোখে পড়ে সাগরে ইলিশ ধরতে যাওয়া কয়েকজন জেলের। তাঁরা দুটি নৌযানের সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে সেটি টেনে নিয়ে আসেন তীরে। ধাতব কাঠামোটি ঘিরে ভিড় বেড়েছে স্থানীয় কৌতূহলী মানুষের।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার সন্তোষপুর ইউনিয়নের বটগাছতলা ইলিশের ঘাটে ধাতব কাঠামোটি নিয়ে আসেন জেলেরা। এটি লম্বায় প্রায় ৩৫ ফুট, ব্যাস ১০ ফুটের মতো।
মোটা রশি দিয়ে বোটের সঙ্গে বেঁধে সেটি টানতে শুরু করি। বিশালাকার বস্তুটি একটি বোটের পক্ষে টানা সম্ভব হচ্ছিল না। পরে আরেকটি বোটের সাহায্যে সেটিকে ঘাটে নিয়ে এসেছি।
জেলেরা জানান, গতকাল দিনের জোয়ারে তাঁরা সন্দ্বীপ চ্যানেলে ইলিশ মাছ ধরতে যান। জাল ছড়ানোর সময় তাঁদের একজনের চোখে পড়ে, কিছুটা দূরে লাল রঙের বড় একটি বস্তু স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসছে। প্রথমে সেটি কী, তাঁরা বুঝতে পারেননি। কাছে আসতেই দেখা যায়, সেটি একটি ‘বিশালাকার’ ধাতব কাঠামো।
কাঠামোটি ঘাটে নিয়ে আসা জেলেদের একজন যিশু জলদাস (৩৫)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তখন বোট থেকে সাগরে জাল ছাড়ছিলাম। দূর থেকে বুঝতে পারছিলাম না জিনিসটা কী। কাছে গিয়ে দেখি, পুরোনো একটা তেলের ট্যাংকারের মতো বস্তু। পরে মোটা রশি দিয়ে বোটের সঙ্গে বেঁধে সেটি টানতে শুরু করি। বিশালাকার বস্তুটি একটি বোটের পক্ষে টানা সম্ভব হচ্ছিল না। পরে আরেকটি বোটের সাহায্যে সেটিকে ঘাটে নিয়ে এসেছি।’
একই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে কৃপা জলদাস নামের আরেক জেলে বলেন, ‘সাগরে জিনিসটি ভাসতে দেখে কৌতূহল থেকে কাছে যাই। পরে মনে হয়েছে, এটি বড় কোনো পুরোনো জাহাজের অংশ হবে। তারপর সবাই মিলে এটিকে তীরে নিয়ে এসেছি।’
ঘাটে আনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও ধাতব কাঠামোটি নিয়ে কৌতূহল দেখা দেয়। অনেকে রাতেই সেটি দেখতে যান। তবে রাতের অন্ধকারে ভালো করে দেখতে না পেয়ে আজ বুধবার সকাল থেকে অনেকেই সেখানে ভিড় করেছেন। স্থানীয় বাজার আর চায়ের দোকানের আড্ডায়ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ধাতব কাঠামোটি। এটিকে ঘিরে বাড়তে থাকে বাসিন্দাদের জল্পনাকল্পনা। কেউ দাবি করেন, কোনো জাহাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভেসে আসা ট্যাংকার এটি; ভেতরে মালামাল রয়েছে—এমন ধারণার কথাও প্রকাশ করেন কেউ কেউ।
আজ সকাল সাতটায় সরেজমিনে দেখা যায়, ঘাটের কাছেই একটি খালে খুঁটির সঙ্গে ধাতব কাঠামোটির দুই পাশ দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। এটি দেখতে তেলবাহী ট্রেনের ট্যাংকারের মতো। দীর্ঘদিন সমুদ্রে ভেসে থাকার চিহ্নও কাঠামোটিতে স্পষ্ট। কোথাও রং উঠে গেছে, কোথাও মরিচা পড়েছে। এক প্রান্তের বর্ধিত একটি অংশে মোটা লোহার কড়া (হুকের মতো) রয়েছে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কুমিরায় দীর্ঘদিন জাহাজ কাটার কাজ করেন নিজাম উদ্দিন (৬০)। জাহাজকাটার এই শ্রমিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেখে মনে হচ্ছে, এটি সমুদ্রগামী জাহাজের বিশাল আকৃতির ক্রেনে ব্যবহৃত একটি স্তম্ভ। এ ধরনের স্তম্ভ জাহাজের ক্রেনের মূল কাঠামোর অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।’
তবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) উপপরিচালক নয়ন শীল ধাতব কাঠামোটির ছবি দেখে জানান, এটি কোনো ড্রেজারের কাঠামো হতে পারে। তিনি বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিএ এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখি, এ ধরনের কোনো কাঠামো ভেসে গেছে কি না।’
মালিকের অপেক্ষায় উদ্ধারকারীরা
কাঠামোটির উদ্ধারকারী যিশু জলদাস বলেন, ‘এটা কার, কোথা থেকে এসেছে, আমরা কিছুই জানি না। তবে প্রকৃত মালিক যদি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, আমরা অবশ্যই ফিরিয়ে দেব।’ একই কথা বলেন কৃপা জলদাসও। তাঁর ভাষ্য, ‘আমরা শুধু সাগরে ভাসতে দেখে তীরে এনেছি। মালিক এলে বুঝিয়ে দিতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’
সন্দ্বীপ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুজন হালদার বলেন, সাগরে ভেসে আসা একটি খালি ও পুরোনো ধাতব কাঠামো সন্তোষপুরের ঘাটে আনার খবর তাঁরা পেয়েছেন। এটির মালিকানা দাবি করে কেউ যোগাযোগ করলে সেটি ফিরিয়ে দিতে পুলিশ উদ্যোগী হবে।