শিবপুর উপজেলা চেয়ারম্যানকে গুলি করার ঘটনায় মামলা, এজাহারভুক্ত এক আসামিসহ গ্রেপ্তার ৫

শিবপুর উপজেলা চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খান
ছবি: সংগৃহীত

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খানের (৭০) বাড়িতে ঢুকে তাঁকে গুলি করার ঘটনায় ছয়জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। গতকাল রোববার মধ্যরাতে হারুনুর রশিদ খানের ছেলে আমিনুর রশিদ খানের দেওয়া লিখিত অভিযোগটি আজ সোমবার দুপুরে মামলা হিসেবে নিয়েছে শিবপুর থানা-পুলিশ। এরই মধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত এক আসামিসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গত শনিবার সকাল সোয়া ছয়টার দিকে শিবপুর পৌর এলাকার বাজার সড়কে নিজের বাড়িতে সন্ত্রাসীদের হাতে গুলিবিদ্ধ হন হারুনুর রশিদ খান। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে ওই দিন দুপুরেই তাঁর পিঠে (মেরুদণ্ডসংলগ্ন) বিদ্ধ হওয়া দুটি গুলি অপসারণ করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন। গুলিবিদ্ধ হারুনুর রশিদ খান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি।

মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে শিবপুরের পুটিয়া ইউনিয়নের কামারগাঁও এলাকার আরিফ সরকার (৪০)। অন্য পাঁচ আসামি হলেন পুটিয়া ইউনিয়নের পূর্ব সৈয়দনগর এলাকার মো. মহসিন মিয়া (৪২), কামারগাঁও এলাকার ইরান মোল্লা (৩০), মুনসেফের চর এলাকার মো. শাকিল (৩৫), কামারগাঁও এলাকার মো. হুমায়ুন (৩২) ও নরসিংদী শহরের ভেলানগর এলাকার গাড়িচালক নূর মোহাম্মদ (৪৮)। তবে মামলার এজাহারে হত্যাচেষ্টার কারণ সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি।

পুলিশ বলছে, মামলার এজাহারভুক্ত ছয় আসামির মধ্যে গাড়িচালক নূর মোহাম্মদকে গতকাল রাতে নরসিংদী শহরের ভেলানগর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক চারজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে সোমবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাঁরা হলেন শিবপুরের পুটিয়া ইউনিয়নের কামারগাঁও এলাকার ফরিদ সরকার (৬৩), মোমেন মোল্লা (৫৯), সৈয়দনগর এলাকার সাব্বির মিয়া (৩২) ও মনসুর আহমেদ রানা (৪৩)।

মামলার এজাহারে বাদী আমিনুর রশিদ খান লিখেছেন, আসামিরা হারুনুর রশিদ খানের মুঠোফোনে কল করে এলাকার একটি মসজিদের জন্য অনুদান চাইতে এসেছিলেন। মহসিন মিয়া, ইরান মোল্লা ও শাকিল নামের তিনজন শনিবার সকাল সোয়া ছয়টার দিকে পাঁচতলা বাড়িটির তৃতীয় তলায় গিয়ে কল বেল চাপলে হারুনুর রশিদ খান নিজেই দরজা খুলে দেন। তাঁদের বসতে বলে আপ্যায়নের জন্য পেয়ারা নিয়ে আসেন তিনি। ঠিক তখনই ওই তিনজন পিস্তল বের করে দুটি গুলি করেন। এতে পিঠে গুলি বিদ্ধ হয়ে হারুনুর রশিদ ফ্লোরে লুটিয়ে পড়েন। এরপর তাঁরা সিঁড়ি বেয়ে নেমে মোটরসাইকেলে করে থানাসংলগ্ন সড়ক ধরে পালিয়ে যান। এ সময় হারুনুর রশিদ খানের চিৎকারে তাঁর বোন মরিয়ম খানম ও ভগ্নিপতি শাজাহান মিয়া দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জরুরি চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। পরে দুপুরে সেখানে অস্ত্রোপচার করে দুটি গুলি বের করে আনা হয়। বর্তমানে হাসপাতালটির নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে আছেন।

মামলার বাদী আমিনুর রশিদ খান বলেন, ‘আমার বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধি। দীর্ঘ ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। উপজেলার নানা শ্রেণি–পেশার লোকজন সব সময়ই বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তাঁর কাছে আসেন। গত শুক্রবার রাতে আরিফ সরকার বাবার মুঠোফোনে কল করে বলেছিলেন, পরদিন সকালে তাঁর কয়েকজন লোক একটি মসজিদের জন্য অনুদান চাইতে আসবেন। কিন্তু তাঁর নাম করে আসা ওই তিনজন লোক গুলি করে দেবেন, আমার বাবা ভাবতেও পারেননি। আরিফ সরকারের পরিকল্পনা ও হুকুমেই ওই তিনজন আমার বাবাকে মেরে ফেলতে গুলি করেছিলেন।’

স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বলছেন, শিবপুরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির দুটি পক্ষ। এক পক্ষে আছেন বর্তমান সংসদ সদস্য জহিরুল হক ভূঁইয়া মোহন, অন্য পক্ষে সাবেক সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম মোল্লা। দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি থাকায় তৃণমূলের রাজনীতিতে প্রভাব বেশি হারুনুর রশিদ খানের। এ জন্য দুই পক্ষই তাঁকে নিজেদের সঙ্গে রাখতে চায়। অন্যদিকে হারুনুর রশিদ খান একেক সময় একেক পক্ষের সঙ্গে সক্রিয় থেকে রাজনীতি করছেন। তিনি যখন যে পক্ষের সঙ্গে থাকেন, ওই পক্ষই দলীয় নেতা-কর্মীদের সমর্থন ও সাধারণ মানুষের ভোট পায় বেশি। বর্তমানে হারুনুর রশিদ খান সিরাজুল ইসলাম মোল্লার সঙ্গে আছেন।

এদিকে জেলার সবচেয়ে বড় গরুর হাট পুটিয়া বাজারের ইজারা গত বছর পেয়েছিলেন যৌথভাবে খোরশেদ হাজি ও আরিফ সরকার। এ বছর আরিফ সরকারকে বাদ দিয়ে খোরশেদ হাজিকে হাটের ইজারা দেন উপজেলা চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খান। তিন কোটি টাকার বেশি ডাক ওঠা হাটের ইজারা না পাওয়ায় হারুনুর রশিদ খানের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন আরিফ সরকার। আরিফ সরকার সংসদ সদস্য জহিরুল হক ভূঁইয়ার ঘনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে পরিচিত।

শিবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফিরোজ তালুকদার বলেন, মামলার এক নম্বর আসামি আরিফ সরকারকে ঢাকায় ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে বলে শুনেছেন। তবে তাঁকে তাঁদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। উপজেলা চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খান হত্যাচেষ্টায় জড়িত ও এজাহারভুক্ত অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান চলছে। পুলিশি তদন্ত শেষেই নিশ্চিত হওয়া যাবে, হত্যাচেষ্টার কারণ রাজনৈতিক না অন্য কিছু।