প্রাণীর সুরক্ষা ও অধিকার রক্ষায় কাজ করেন তাঁরা
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার একটি গ্রাম জালালপুর। আন্ধারমানিক নদের ধারে এটি অবস্থিত। ২০২৪ সালের ১৩ জুনের ঘটনা। জোয়ারের পানির সঙ্গে একটি ইরাবতী প্রজাতির ডলফিন ঢুকে পড়ে গ্রামে। একপর্যায়ে ডলফিনটি একটি ডোবায় আটকা পড়ে ছটফট করতে থাকে।
ওই খবর পান তরুণ বায়েজিদ মুন্সি। দ্রুত তিনিসহ কয়েকজন চলে আসেন জালালপুরে; দেখেন ডলফিনটি অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাঁরা ডলফিনটির পরিচর্যা করেন। প্রায় চার ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রেখে সুস্থ করা হয় ডলফিনটিকে। এরপর স্থানীয় জেলেদের সহায়তায় একটি মাছ ধরা ট্রলারে করে সাগরমোহনায় নিয়ে ডলফিনটি ছেড়ে দেওয়া হয়।
বন্য প্রাণীর সুরক্ষা ও লোকালয়ে বন্য প্রাণী চলে এলে সেগুলো উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে অবমুক্ত করেন বায়েজিদ (২২)। তাঁর বাড়ি কলাপাড়ার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের আমিরাবাদ গ্রামে। তিনি উপজেলা সদরের সরকারি মোজাহার উদ্দিন বিশ্বাস ডিগ্রি কলেজে স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। পড়ালেখার পাশাপাশি স্থানীয় একটি ওষুধের দোকানে চাকরি করেন তিনি।
ছোটবেলা থেকেই পশুপাখির প্রতি মায়া বায়েজিদের। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় পথে–ঘাটে কুকুর, বিড়াল বা কোনো পরিযায়ী পাখি অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকতে দেখতাম। নিজের কাছেই প্রশ্ন করতাম, এসব প্রাণী পথে-প্রান্তরে মরে যাবে? মনে মনে এ–ও ভাবতাম, এসব প্রাণীর সুরক্ষায় যদি কাজ করতে পারতাম। একটু পরিচর্যা করতে পারলেই এগুলোকে বাঁচানো যায়, এটাও বুঝতাম। তবে পাছে লোকে কী বলবে, ভেবে দ্বিধা–দ্বন্দ্ব কাজ করত। মনে মনে চিন্তা করি, যদি কারও পরামর্শ পাওয়া যেত, তাহলে প্রাণী সুরক্ষার কাজ করতাম।’
২০১৯ সালের শেষ দিকের কথা। পটুয়াখালী শহরে কুকুর নিধনের উদ্যোগ নেয় পৌর কর্তৃপক্ষ। তখন এর প্রতিবাদ করেন এইচ এম শামীম নামের স্থানীয় এক তরুণ। শামীমের সঙ্গে বায়েজিদের যোগাযোগ ছিল আগে থেকেই। শামীম বিষয়টি নিয়ে বায়েজিদের সঙ্গে আলাপ করেন। তাঁরা দুজন সিদ্ধান্ত নেন, প্রাণী সুরক্ষায় কাজ করবেন। তাঁরা ২০২০ সাল থেকে পরিযায়ী পাখির সুরক্ষা, বন্য প্রাণী লোকালয়ে চলে এলে সেগুলো উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে অবমুক্ত করার কাজ শুরু করেন। পরে তাঁরা অ্যানিমেল লাভারস অব পটুয়াখালী নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এ সংগঠনের কলাপাড়া টিমের প্রধান বায়েজিদ মুন্সি।
এ সংগঠনের মাধ্যমে পটুয়াখালীসহ বরিশালের হিজলা, বরগুনার আমতলী ও পাথরঘাটা, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায় কার্যালয় চলে। বর্তমানে এ সংগঠনের ৭০ জন সদস্য। এর মধ্যে বন্য প্রাণীর পরিচর্যা, ফরেনসিক অভিজ্ঞতা, বন ও সংশ্লিষ্ট আইনের ওপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্য রয়েছেন ২৩ জন। সাপ উদ্ধারে প্রশিক্ষিত সদস্য রয়েছেন ১২ জন ও কুকুর-বিড়ালের প্রাথমিক চিকিৎসায় অভিজ্ঞ সদস্য রয়েছেন ২০ জন।
অ্যানিমেল লাভারস অব পটুয়াখালীর মাধ্যমে পোষা, মালিকানাবিহীন, বন্য প্রাণীসহ অসহায় প্রাণীর জন্য কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা; গৃহহীন বা রাস্তায় বসবাস করে, এমন কুকুর-বিড়াল বা অন্যান্য অসহায় প্রাণীর জন্য দুর্যোগের সময় খাবার প্রদান এবং অসুস্থ প্রাণীর চিকিৎসা; বিপদাপন্ন প্রাণী উদ্ধারসহ অবমুক্ত করার পাশাপাশি বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়া হারিয়ে যাওয়া পোষা প্রাণী উদ্ধার করে প্রকৃত মালিকের কাছে পৌঁছে দেওয়া, সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রাণিজগৎ সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য উদ্ধার করে তা যথাযথভাবে অবমুক্ত করা, প্রাণিকুলের সুরক্ষার কাজে নতুন স্বেচ্ছাসেবক তৈরি এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।
বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন-২০১২ সম্পর্কেও জনমানুষকে সচেতন করার কাজও করছে অ্যানিমেল লাভারস অব পটুয়াখালী। সংগঠনটি বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, জেলেপল্লিতে লিফলেট বিতরণ, মাইকিং, পথসভা, আলোচনা সভার আয়োজন করে। এ ছাড়া পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনের সহায়তায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উদ্যোগে পটুয়াখালী পৌরসভা, কলাপাড়া পৌরসভা ও কুয়াকাটা পৌরসভায় ১ হাজার ৫০০ মালিকানাবিহীন কুকুর-বিড়ালকে জলাতঙ্ক টিকা দেওয়া হয়েছে।
বায়েজিদ মুন্সী তাঁর এ কাজের জন্য বন বিভাগ খুলনা থেকে সনদ পেয়েছেন। এই স্বীকৃতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বন্য প্রাণী অথবা জীববৈচিত্র্য পরিবেশ-প্রতিবেশের শৃঙ্খল রক্ষার জন্য কতটা জরুরি তা সবাইকে বুঝতে হবে, আমাদের বুঝাতেও হবে।’
কলাপাড়া উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ইউএলও) আতিকুর রহমান বলেন, ‘প্রাণিকুল টিকে না থাকলে পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট হয়। বয়েজিদ বিষয়টি উপলব্ধি করে প্রাণিজগৎকে নিয়ে কাজ করছেন, আমাদের জন্য তা দৃষ্টান্তমূলক। তাঁর এ কাজ অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।’