এবার কোরবানির হাট মাতাচ্ছে ‘পিঙ্ক’ মহিষ
পশুর হাটে প্রবেশমুখের ঠিক পরেই মানুষের জটলা। বয়সী মানুষদের চেয়ে শিশু-কিশোরদেরই ভিড় বেশি। হাটের দুই মহিষকে নিয়ে তাদের যত আগ্রহ। আগ্রহের এই কারণ অন্য কিছু নয়, মহিষ দুটির গায়ের রং। পুরো শরীর গোলাপি। গায়ের রঙের কারণে হাটে আসা ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছে এ দুটি মহিষ এখন পরিচিতি পেয়েছে ‘পিঙ্ক মহিষ’ নামে। তবে গায়ের ও চুলের কারণে প্রায় সবাই ডাকছেন ‘ট্রাম্প’ নামে। যদিও বিক্রেতা নাম দেননি।
ভিন্ন রঙের এমন দুটি মহিষ দেখা যায় চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়ার কর্ণফুলী পশুর হাটে। নূরনগর হাউজিং এলাকায় বসেছে শহরের সবচেয়ে বড় অস্থায়ী এই পশুর হাট। এবারের বাজারে মূল আকর্ষণে পরিণত হয়েছে এ দুটি মহিষ, যা আনা হয়েছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির লেলাং থেকে।
আজ সোমবার বিকেলে হাটে গিয়ে দেখা যায়, মহিষকে সামাল দিতে যত না কষ্ট হচ্ছে, তার চেয়ে আগ্রহীদের ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে খামারি মো. নুরুল আলমকে। কোরবানির গরু কিনতে আসা অনেকেই একবারের জন্য ঢুঁ মারছেন গোলাপি রঙের এই দুটি মহিষ দেখতে। মুঠোফোনে ভিন্ন রঙের মহিষ দুটির কেউ ভিডিও করছেন, কেউ ছবি তুলছেন। ভিন্ন রঙের মহিষ নিয়ে তাঁদের একের পর এক প্রশ্ন। হাসিমুখে উত্তর দিচ্ছিলেন নুরুল আলম।
ভিড় সামলে এক ফাঁকে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন নুরুল আলম। মহিষের নাম জানতে চাইলে হেসে উঠে তিনি বলেন, ‘সবাই তো মহিষ দুটিকে ট্রাম্প বলতেছেন; কিন্তু আমি কোনো নাম দিইনি।’
এরপর মহিষ দুটির বিস্তারিত জানান নুরুল আলম। গায়ের রঙের কারণেই এ দুটি মহিষ সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানান তিনি। ভৈরব থেকে মহিষ দুটি কেনা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তিনি একসময় কৃষিকাজ করতেন। চার-পাঁচ বছর আগে কৃষিকাজ ছেড়ে খামারের দিকে ঝুঁকেছেন। গরু-মহিষ লালন-পালন শুরু করেছেন। তিন বছর আগে এক বন্ধু গোলাপি রঙের মহিষ দুটির খবর দেন। এ খবর পেয়ে ভৈরব যান। দেখেই পছন্দ হয়। দরদাম করে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিয়ে কিনে চট্টগ্রামে নিয়ে আসেন।
তিন বছর ধরে গ্রামে নিজের খামারে লালন-পালন করলেও পরিবারের বাইরে কাউকে মহিষ দুটি দেখতে দেননি বলে জানান নুরুল আলম। তাঁর মতে, মহিষ দুটি খুব সংবেদনশীল। তাই লালন-পালনের সময় খুব সতর্ক ছিলেন। মানুষের মতিগতি বোঝা যায় না। তাই বাইরের কাউকে দেখতে দেননি। নিজের খামারেই রাখতেন সারাক্ষণ। বাইরে নিয়ে যেতেন না। গরমের দিনে বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবস্থা ছিল। আদর-যত্নের কমতি ছিল না।
সাধারণত মহিষের গায়ের রং ঘন কালো বা কালচে ধূসর হয়। তবে কখনো কখনো ভিন্ন রঙেরও হয়। গোলাপি রঙের মহিষের প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, এগুলো অ্যালবিনো মহিষ। ত্বকে মেলানিন নামক একধরনের রঞ্জকের অসামঞ্জস্যপূর্ণ উপস্থিতির কারণে মহিষের গায়ের রং কালো না হয়ে সাদা বা গোলাপি হয়। এটি মহিষের কোনো রোগ নয়।
দুটি একসঙ্গে কিনলে ফ্রি দেবেন খাসি
গত বুধবার গ্রামের খামার থেকে চট্টগ্রাম নগরের পশুর হাটে দুটি মহিষ নিয়ে আসেন নুরুল আলম। এর পর থেকেই একের পর এক লোকজন মহিষের দরদাম করে যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত মহিষ দুটির দর হাঁকিয়েছেন সাড়ে ১১ লাখ টাকা। একটির দাম ছয় লাখ, অন্যটির সাড়ে পাঁচ লাখ। তবে ক্রেতারা এখনো ওই দর দেননি। তাঁদের কেউ ছয় লাখ, কেউ সাত লাখ টাকা বলছেন। ক্রেতাদের দরে সন্তুষ্ট নন নুরুল আলম।
নুরুল আলম জানান, অনেক আদর-যত্ন করে মহিষ দুটি লালন-পালন করেছেন। খাবার, থাকার ব্যবস্থা করতে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। পরিশ্রম করেছেন। কষ্টও হয়েছে। তাই সাড়ে ১১ লাখ টাকা দাম রেখেছেন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেখবেন। ১০ লাখ টাকা হলে দিয়ে দেবেন। যদি কোনো ক্রেতা একসঙ্গে দুটি মহিষ কেনেন, তাহলে একটি খাসি বিনা মূল্যে দেবেন।
এবারের হাটে এই দুটি মহিষ ছাড়া আরও একটি মহিষ ও একটি গরু এনেছেন নুরুল আলম। যদিও সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত একটি পশুও বিক্রি হয়নি। অবশ্য কাল-পরশুর মধ্যে বিক্রি হয়ে যাবে বলে আশা তাঁর।
এখনো জমেনি বাজার
গোলাপি রঙের মহিষ দেখতে হাটে ভিড় থাকলেও সামগ্রিকভাবে বাজার এখনো জমেনি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকেও প্রচুর গরু নিয়ে হাটে এসেছেন ব্যাপারীরা। বাজারও প্রস্তুত ক্রেতাদের জন্য। তবে তাঁদের দেখা মিলছে কম।
৩৫টি গরু নিয়ে এসেছেন ব্যাপারী মোহাম্মদ শাহেদ। তাঁর কয়েকটি ছাড়া সব কটি গরু মাঝারি আকৃতির। অন্যগুলো বড় আকারের। বিকেলে অলস সময় পার করছিলেন। ক্রেতা নেই। বাজারের অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত বছর এমন সময়ে হাটে মানুষ আর মানুষ; কিন্তু এবার দেখেন ফাঁকা। ৩৫টি গরুর মধ্যে মাত্র ৭টি বিক্রি করতে পেরেছেন। তা–ও পরিচিত ব্যক্তিরা নিয়েছেন। গতবার ৬৫টি গরুর মধ্যে ২০-২২টি বিক্রি করে ফেলেছিলেন। তিনি বলেন, দেশ-বিদেশের পরিস্থিতি মিলিয়ে মানুষের কাছে টাকাপয়সা কম মনে হচ্ছে। তাই বাজারে ক্রেতাদের ভিড় নেই। আবার কেউ কেউ অস্বাভাবিক কম দর দিচ্ছেন।
ভোলা থেকে ছোট আকারের ৪৫টি গরু এনেছেন মোশাররফ হোসেন। আজ বাজারে এসেছেন লোকজন সঙ্গে নিয়ে। তবে এখনো বিক্রি হয়নি। অবশ্য এ নিয়ে হতাশ নন তিনি। প্রথম আলোকে মোশাররফ বলেন, তিনি যে দামের গরু এনেছেন সেগুলোর চাহিদা রয়েছে। কাল-পরশুর মধ্যে সব বিক্রি হয়ে যাবে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এবার বড় গরুর সংখ্যা কম। আগের বছরের তুলনায় হাটে ছোট আকারের গরু এসেছে বেশি। মাঝারি আকৃতির গরুও আছে প্রচুর। ব্যাপারীরা জানান, এখন পর্যন্ত ক্রেতাদের মধ্যে মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি।
কর্ণফুলী পশুর হাটের ইজারাদার মো. ইব্রাহিম প্রথম আলোকে বলেন, শহরে হাট একটু দেরিতে জমে। ঈদের দুই-তিন আগেই মূলত বিক্রি হয় বেশি। গরু রাখা, খাওয়ানো নিয়ে ঝক্কিঝামেলা রয়েছে। এ কারণে মানুষ শেষ মুহূর্তে গরু কেনেন। তাই তাঁরা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন।
চট্টগ্রাম নগরে এবার তিনটি স্থায়ী ও সাতটি অস্থায়ী হাট বসেছে। কর্ণফুলী পশুর হাট ছাড়া অন্য হাটগুলোতেও ধীরে ধীরে বেচাবিক্রি বাড়ছে বলে জানান ইজারাদাররা। তবে তাঁরা জানান, মূল বেচাবিক্রি চলবে ঈদের আগের দুই দিন।