বাবার শিকড়ের টানে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে সিদ্দিক

ভগ্নিপতি নিজাম উদ্দিন খানের সঙ্গে পাকিস্তানি তরুণ সিদ্দিক খান। গতকাল বৃহস্পতিবার মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার গাজীপুর গ্রামেছবি: প্রথম আলো

পাকিস্তানি তরুণ সিদ্দিক খান ওরফে ওমর সাদিকের (২৮) বাবা আলফু মিয়া ছিলেন বাংলাদেশের নাগরিক। মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৪ বছর বয়সে পরিবারের কাউকে কিছু না বলে পাকিস্তানি এক নাগরিকের সঙ্গে তিনি পাকিস্তানে চলে যান। এরপর বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তাঁর সন্ধান পাননি স্বজনেরা। পাকিস্তানেই বড় হন আলফু মিয়া।

সেখানে বিয়ে করে সংসার পাতেন আলফু মিয়া। দীর্ঘদিন পরিবারের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ ছিল না। পরে স্ত্রী কসর পারভিনের অনুরোধে ২০০০ সালে দুই বছর বয়সী ছেলে সিদ্দিক খানসহ বাংলাদেশে বেড়াতে আসেন তিনি। তবে দেশে আসার তিন দিনের মাথায় তাঁর স্ত্রী মারা যান। পরে স্ত্রীর লাশ নিয়ে পাকিস্তানে ফিরে যান আলফু। এরপর আবারও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় যোগাযোগ। ২০০৬ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি।

সম্প্রতি ফেসবুকের একটি পেজে দেওয়া পোস্টের সূত্র ধরে পাকিস্তানে থাকা আলফু মিয়ার ছেলে সিদ্দিক খানের সন্ধান পান স্বজনেরা। পরে বাংলাদেশে আসেন সিদ্দিক। এখন তিনি বিভিন্ন আত্মীয়ের বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁকে পেয়ে খুশি স্বজনেরাও।

স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, সিদ্দিক খানের দাদা আত্তর মিয়া মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের গাজীপুর চা-বাগানে কাজ করতেন। তিনি বাগানের গাড়ি চালাতেন। তাঁর তিন ছেলে—মখলিছুর রহমান, গুলাইছ মিয়া ও আলফু মিয়া। আত্তর মিয়া ২০০৩ সালে ও তাঁর স্ত্রী আবজান বিবি ২০০৫ সালে মারা যান।

২০০০ সালে দুই বছর বয়সী ছেলে সিদ্দিক খান ও স্ত্রী কসর পারভিনকে নিয়ে বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছিলেন আলফু মিয়া
ছবি: সংগৃহীত

আলফুর বড় ভাই মখলিছুর রহমানের জামাতা নিজাম উদ্দিন খান বলেন, দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশে এলেও পাকিস্তানে ফিরে গিয়ে আর কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি আলফু মিয়া। কয়েক মাস আগে ফেসবুকে ‘বঙ্গ ভিটা’ নামের একটি পেজে আলফু মিয়ার সন্ধানে পোস্ট দেন। পোস্টে আলফুর বাংলাদেশ সফরের সময় তোলা কয়েকটি ছবিও যুক্ত করা হয়।

নিজাম বলেন, পোস্টটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত পাকিস্তানি শিক্ষার্থী মুহাম্মাদ তাহির ওয়াহিদের নজরে পড়ে। পরে তিনি ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনের সহায়তায় আলফুর ঠিকানা খুঁজে বের করেন। সেখানে যোগাযোগ করে জানা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় আলফু মারা গেছেন। এরপর তাঁর ছেলে সিদ্দিক খানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়।

নিজাম উদ্দিন খান বলেন, ২২ মার্চ তিন মাসের ভিসা নিয়ে সিদ্দিক একাই বাংলাদেশে আসেন। তাঁর খোঁজ পাওয়ায় শ্বশুরবাড়ির লোকজন খুব খুশি। আশপাশের লোকজনও তাঁকে দেখতে ভিড় জমান।

সিদ্দিক এরই মধ্যে গাজীপুর চা-বাগানে তাঁদের পূর্বপুরুষের বাড়ি ঘুরে দেখেছেন। বিভিন্ন স্থানে বেড়াচ্ছেন। স্থানীয়দের সঙ্গেও তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে সিদ্দিকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, বাবার মৃত্যুর পর গোলাম সরদার নামের এক ব্যক্তি তাঁকে লালন-পালন করেন। তাঁকে তিনি চাচা বলে ডাকেন। পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির মরগামোড় সাজমান কলোনির নূর মসজিদ এলাকায় তাঁদের বাড়ি। ২০২১ সালে তিনি বিয়ে করেছেন। তাঁর কোনো সন্তান নেই।

বাংলাদেশে ছোটবেলায় আসার স্মৃতি মনে না থাকলেও এবার এসে কিছুটা বাংলা শিখে ফেলেছেন সিদ্দিক। উর্দুর ফাঁকে ফাঁকে বাংলাতেও কথা বলেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে অনুভূতি জানতে চাইলে সিদ্দিক বললেন, ‘খুব ভালো লাগছে। আত্মীয়স্বজনকে দেখে মন ভরে গেছে।’ এরপর সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় যোগ করেন, আবার আইমু (আসব)। খোদা হাফেজ।’