বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্র প্রস্তুতে জড়িত ছিল যুক্তরাষ্ট্র: পঞ্চগড়ে রেলমন্ত্রী

পঞ্চগড়ে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম। মঙ্গলবার সকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে
ছবি: প্রথম আলো

রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর মনে করেছিলাম, আমরা মুক্ত হলাম। মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র সমর্পণ করলেন। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা বসে ছিল না। তারা মুক্তিযুদ্ধকে মেনে নেয়নি। একদিকে দেশের অভ্যন্তরে, দেশের বাইরে পরাশক্তি আমেরিকা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যেমন বিরোধিতা করেছিল, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ক্ষেত্রে যে ষড়যন্ত্র হয়েছিল, তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা, সেই ক্ষেত্র প্রস্তুতের সঙ্গে আমেরিকা সরাসরি জড়িত ছিল।’

আজ মঙ্গলবার সকালে পঞ্চগড়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৮তম শাহাদতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন পঞ্চগড়-২ (বোদা-দেবীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার অন্যতম কৌঁসুলি নূরুল ইসলাম বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা করতে গিয়ে আমরা সাক্ষ্য-প্রমাণে যত কিছু পেয়েছি, তদন্ত করতে গিয়ে যারা আসামি, তারা স্বীকারোক্তি দিয়েছে, সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিয়েছে, অনেকে মারা গেছে তাদের বক্তব্য আছে, কে কোথায় কীভাবে ষড়যন্ত্র করেছে, সেই কথাগুলি আছে—সবই কিন্তু মামলার রায়ের এই ফোর পিলারের মধ্যে আসেনি। কিছু রেকর্ডে আছে।’

রেলমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু সারা জীবন যে রাজনীতি করেছেন, তার একটা দর্শন ছিল, লক্ষ্য ছিল। বঙ্গবন্ধুর সমসাময়িক যাঁরা রাজনীতি করতেন, তাঁদের ছাপিয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মানুষের আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক দৃঢ়তা, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, জনগণের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, সর্বোপরি সাংগঠনিক দক্ষতা তাঁকে বঙ্গবন্ধু ‍হিসেবে তৈরি করেছিল এবং সমসাময়িক রাজনীতিবিদদের থেকে তাঁকে আলাদা করেছিল। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল গরিব ও দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তিই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। এটি করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থা থেকে নিজেকে আলাদা করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠন করছিলেন। যেখানে এক সাগর রক্ত ‍দিতে হয়েছে। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা সহ্য করতে হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের কথা উল্লেখ করে রেলমন্ত্রী বলেন, ‘ভারত আমাদের কীভাবে সহযোগিতা করেছে, মুক্তিযোদ্ধারাসহ সবাই জানেন। তারা এক কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র দিয়েছে, ট্রেনিং দিয়েছে। শুধু তা–ই নয়, বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী গোটা পৃথিবী ঘুরেছেন। তারা অনেক ঝুঁকি নিয়েছে। কারণ পাকিস্তান, আমেরিকা ও চায়না (চীন) মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের পাশে ছিল না। কিন্তু আমাদের অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছিল রাশিয়া।’

নূরুল ইসলাম বলেন, ‘পঁচাত্তরের পরে কী হয়েছে। জাতীয় চার নেতাকে হত্যাকে করা হয়েছে। জাসদকে ব্যবহার করা হয়েছে। তারা অনেক দিন পরে বুঝতে পারলেও তাদের করার কিছুই ছিল না। কিন্তু ক্ষেত্র প্রস্তুত করার তারা (জাসদ) হাতিয়ার হয়েছিল। আজ দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পর আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফেরত নিয়ে এসেছেন। আজকে বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারছেন।’

রেলমন্ত্রী বলেন, ‘যারা ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং লক্ষ্যকে ছিনতাই করেছিল, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা সেটাকে মূল ধারায় নিয়ে এসেছি। তবে আজকেও কিন্তু সেই একই ষড়যন্ত্র। সেই আমেরিকা আবার কিন্তু সামনে এগিয়ে এসেছে। গণতন্ত্রের বুলি দিয়ে, মানবাধিকারের কথা বলে বঙ্গবন্ধুর খুনিকে আশ্রয় দিয়ে বসে আছে। কানাডাও তাদের দেশে খুনিকে আশ্রয় দিয়েছে।’

জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে পঞ্চগড়-১ (সদর-তেঁতুলিয়া-আটোয়ারী) আসনের সংসদ সদস্য মজাহারুল হক প্রধান, পুলিশ সুপার এস এম সিরাজুল হুদা, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল হান্নান শেখ, পঞ্চগড় পৌরসভার মেয়র জাকিয়া খাতুন, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার সাদাত প্রমুখ বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান শেষে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা।

এর আগে সকাল সাড়ে ৯টায় পঞ্চগড় সার্কিট হাউস চত্বরে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম ও সংসদ সদস্য মজাহারুল হক প্রধান। এ সময় জেলা ও পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন। এ সময় ১৫ আগস্টে শহীদ সবার রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

পরে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে আয়োজিত শোক দিবসের আলোচনায় যোগ দেন রেলমন্ত্রী। সেখানে আলোচনা সভা ছড়াও মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।