বেতন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ
আশুলিয়ায় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ২৫ কারখানা ছুটি ঘোষণা
ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়ায় বিক্ষোভ করেছেন কয়েকটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাঁদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। শ্রমিকদের ইটপাটকেলের আঘাতে ৪-৫ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকার ২৫টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
আশুলিয়া থানা–পুলিশ ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১–এর কর্মকর্তারা জানান, আজ শনিবার সকাল থেকে জিরাবো এলাকার নাঈম নিটওয়ারের শ্রমিকেরা কারখানায় শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে কর্মবিরতি পালন করেন। এরপর কারখানা থেকে বেরিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।
পুলিশ ও সেখানকার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকদের ভাষ্য, একপর্যায়ে নাঈম নিটওয়ারের শ্রমিকেরা আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকদের বের করার চেষ্টা করেন এবং আশপাশের কারখানা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এরপর পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, কালোতালিকাভুক্তি বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে কাঠগড়া, নিশ্চিন্তপুরসহ আশপাশের এলাকার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরাও আন্দোলনে নামেন। শ্রমিকদের একটি অংশ বাইপাইল থেকে আবদুল্লাহপুর সড়কে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
এ সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন শ্রমিকেরা। দুপুর ১২টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ধাওয়া দিয়ে এবং কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে সড়ক থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে দেন। শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে তাঁদের ৪-৫ জন সদস্য আহত হন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ইতিমধ্যে ২৫টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। নিশ্চিন্তপুর এলাকায় পুলিশকে লক্ষ করে বিক্ষোভকারীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে ৪-৫ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। একজনের চোখের ওপরে আঘাত লেগেছে।
বেলা সোয়া একটার দিকে আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হারুন অর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, সকালে নাঈম নিটওয়ারের শ্রমিকেরা কারখানার সামনে বিক্ষোভ করলে পুলিশ তাঁদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। এ ছাড়া নিশ্চিন্তপুর এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শিল্পাঞ্চল পুলিশকে কাঁদানে গ্যাসের শেল ব্যবহার করতে হয়েছে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
নিউএজ গ্রুপের কারখানার এক নারী শ্রমিক জানান, সকাল থেকে বেতন বাড়ানোর দাবিতে কারখানায় কাজ বন্ধ ছিল। আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কারখানার সামনে এসে তাঁদের কারখানা থেকে বের হতে বলেন এবং বিক্ষোভ করেন। পরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। নিউএজ গ্রুপের কারখানার শ্রমিকেরা এ সময় কারখানা থেকে বের হয়ে যান।
শ্রমমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী অক্টোবর মাসের মধ্যেই মজুরি বোর্ড গঠনে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় এবং ঘোষণা বাস্তবায়নে গড়িমসি করায় শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করা। এ ছাড়া ব্ল্যাকলিস্টিং বা কালোতালিকাভুক্তকরণ বন্ধ করা এবং হুটহাট চাকরিচ্যুত করা বন্ধ করার দাবিও জানাচ্ছেন তাঁরা।
খায়রুল মামুন বলেন, ‘গতকাল শুক্রবার রাতে শ্রম মন্ত্রণালয়ে সভায় ডেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, রোববারের মধ্যে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের কার্যক্রম শুরু হবে। সভার এই সিদ্ধান্ত বা বার্তাটি সাধারণ শ্রমিকদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছায়নি। শ্রমিকদের মধ্যে একধরনের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল কাজ করছে। এ কারণে তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। শ্রমিকদের যৌক্তিক সব দাবি দ্রুত পূরণ করতে হবে, এটা আমাদেরও দাবি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাঠগড়ার আমতলা এলাকায় অবস্থিত একটি তৈরি পোশাক কারখানার কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘কাঠগড়া এলাকায় বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে বেশ কিছু কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে। একটি কারখানার শ্রমিকেরা বের হয়ে আশপাশের কারখানার শ্রমিকদেরও বের হতে বলেন। শ্রমিকেরা বের না হলে কারখানা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এ কারণে বাধ্য হয়েই আশপাশের কারখানা ছুটি ঘোষণা করে। পরিস্থিতি খারাপ হলে আমরাও শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দেব।’
বেলা আড়াইটার দিকে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ইতিমধ্যে ২৫টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। নিশ্চিন্তপুর এলাকায় পুলিশকে লক্ষ্য করে বিক্ষোভকারীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে ৪-৫ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। একজনের চোখের ওপরে আঘাত লেগেছে।
ককটেলসদৃশ বস্তু উদ্ধার
দুপুরে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় নাসা গ্রুপের কারখানার সামনে থেকে তিনটি ককটেলসদৃশ বস্তু উদ্ধার করেছে শিল্প পুলিশ।
আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর এসপি মোমিনুল ইসলাম বলেন, বেলা একটার কিছু সময় পর নাসা গ্রুপের কারখানার সামনে থেকে তিনটি ককটেলসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের স্পেশাল রেসপন্স ইউনিটকে (এসআরইউ) বিষয়টি জানানো হয়েছে। তাঁরা ঘটনাস্থলে এসে এ ব্যাপারে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।