বাঁশ-বেত থেকে টাটকা সবজি, ১৫০ বছর পরও জমজমাট ছলিমগঞ্জ হাট

এ হাটের টাটকা সবজির সুনাম রয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শ্রীনাথপুর গ্রামের ছলিমগঞ্জ হাটেছবি: প্রথম আলো

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। মাথায় টুকরি নিয়ে একে একে হাটে ঢুকছেন গ্রামের মানুষ। কারও টুকরিতে শাকসবজি, কারও কাছে পান-সুপারি, কেউ এনেছেন কলা। হাটের এক পাশে মাছ, শুঁটকি ও মসলার দোকান। বিদ্যুৎ নেই, তাই কয়েকটি দোকানে জ্বলছে চার্জার বাতি। অন্ধকারের মধ্যেই চলছে কেনাবেচা, আড্ডা আর মানুষের আনাগোনা।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের শ্রীনাথপুর গ্রামের এই হাটের নাম ছলিমগঞ্জ। স্থানীয় কৃষিপণ্য ও পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা বাঁশ-বেত বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে দেড় শতাধিক বছর আগে এর যাত্রা শুরু। সময়ের সঙ্গে বাঁশ-বেতের সেই জৌলুশ হারিয়েছে। তবে স্থানীয় শাকসবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বেচাকেনায় এখনো জমজমাট এই পুরোনো হাট।

প্রায় ৩০ বছর ধরে হাটে শুকনা খাবার বিক্রি করছেন সুজিত মোদক। ২৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কমলগঞ্জের শ্রীনাথপুর গ্রামের ছলিমগঞ্জ হাটে
ছবি: প্রথম আলো

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফকির মো. ছলিম উল্লাহ চৌধুরী তাঁর জমির একটি অংশে এই হাট বসান। তখন সপ্তাহে দুই দিন—শনি ও মঙ্গলবার—হাট বসত। স্থায়ী কোনো দোকান ছিল না। আশপাশের গ্রামের মানুষ নিজেদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে আসতেন, আবার প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে নিয়ে যেতেন। এখনো ওই দুই দিন হাট বসে। তবে এর সঙ্গে গড়ে উঠেছে স্থায়ী দোকানপাট। টাটকা শাকসবজির জন্যও হাটটির সুনাম রয়েছে। চিৎলিয়া, জাঙ্গালিয়া, যোগিবিলসহ আশপাশের গ্রামের মানুষ নিয়মিত এখানে আসেন।

২৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে কথা হয় ছলিম উল্লাহ চৌধুরীর পঞ্চম প্রজন্মের বংশধর শিক্ষক মো. মশিউর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, তাঁর পূর্বপুরুষের নামেই হাটটির নাম ছলিমগঞ্জ। বাড়ির পুকুরের পূর্ব পাশে তাঁর জমিতেই হাটটি শুরু হয়েছিল।

মশিউর রহমান জানান, ছলিম উল্লাহর আদি পৈতৃক বাড়ি বর্তমান সিলেটের গোলাপগঞ্জের ভাদেশ্বরে। সেখান থেকে ১৯ শতকের প্রথম দিকে তিনি কমলগঞ্জের শ্রীনাথপুরে এসে বসতি স্থাপন করেন। কৃষ্ণরায় নাথ নামের এক জমিদারের এস্টেট তিনি কিনে নেন। ওই এস্টেটে জমির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩০০ হাল, যার এক হাল সমান ১২ কিয়ার এবং এক কিয়ার সমান ৩০ শতক। একপর্যায়ে ছলিম উল্লাহ বাড়ির সামনের পুকুরের পূর্ব পাশে নিজের জমিতে এই ‘গঞ্জ’ বা হাট স্থাপন করেন।

কমলগঞ্জ কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য আগে থেকেই পরিচিত ছিল বলে জানান স্থানীয় লোকগবেষক আহমদ সিরাজ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, স্থানীয় কৃষকেরা নানা ধরনের সবজি উৎপাদন করতেন। পাশাপাশি পাহাড় থেকে বাঁশ-বেত সংগ্রহ করে তা এই হাটে বিক্রি করা হতো। একসময় ছলিমগঞ্জ ছিল এসব পণ্যের গুরুত্বপূর্ণ বেচাকেনার কেন্দ্র।

পান-সুপারি নিয়ে বসেছেন দুই বিক্রেতা। ২৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কমলগঞ্জের শ্রীনাথপুর গ্রামের ছলিমগঞ্জ হাটে
ছবি: প্রথম আলো

স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, একসময় এই অঞ্চলের বড় বাজার ছিল ছলিমগঞ্জ। মণিপুরি–অধ্যুষিত তিলকপুর থেকে প্রচুর সবজি আসত। ভানুবিল থেকে আসত দই, বাঁশও আসত প্রচুর। তখন স্থায়ী দোকান ছিল না। সন্ধ্যা হলে মানুষের ভিড়ে হাঁটার জায়গা থাকত না। তবে নব্বইয়ের দশক থেকে হাটে বাঁশ আসা কমতে থাকে। সংরক্ষিত বন থেকে বাঁশ সংগ্রহে নানা বাধা এবং বনে বাঁশের পরিমাণ কমে যাওয়ায় সেই বেচাকেনা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এখন ছলিমগঞ্জের পরিচিতি মূলত স্থানীয় টাটকা শাকসবজির হাট হিসেবে।

ওই দিন সন্ধ্যায় হাটে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ১০০টি স্থায়ী দোকানের পাশাপাশি বসেছে অর্ধশতাধিক অস্থায়ী দোকান। কেউ সবজি, কেউ মাছ, কেউ শুঁটকি, কেউ মসলা কিংবা শুকনা খাবার নিয়ে বসেছেন। বিক্রেতাদের অনেকে নিজেদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে এসেছেন।

বাজারে ঝালমুড়ি বিক্রি করছেন একজন। ২৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কমলগঞ্জের শ্রীনাথপুর গ্রামের ছলিমগঞ্জ হাটে
ছবি: প্রথম আলো

শুকনা খাবার বিক্রেতা সুজিত মোদক প্রায় ৩০ বছর ধরে এই হাটে আসছেন। তিনি জানান, সন্ধ্যার পর হাট বেশি জমে। গ্রামের মানুষ দিনের কাজ শেষে বাজার করতে আসেন। অনেকে কেনাকাটার পাশাপাশি পরিচিতজনদের সঙ্গে আড্ডাও দেন।

হাটের চায়ের দোকানগুলোতেও তখন ভিড়। কেউ সারা দিনের কাজ শেষে একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন, কেউ গল্প করছেন। সন্ধ্যার বেশ পর বিদ্যুৎ এলে জ্বলে ওঠে দোকানগুলোর বাতি। এতক্ষণ চার্জার বাতির আলোয় চলা হাটটি তখন কিছুটা প্রাণ ফিরে পায়।