দিনাজপুরে লিচুর উৎসব

গাছে গাছে এখন রসালো লিচুর উচ্ছ্বাস। দিনাজপুরের বিরল উপজেলার মাধববাটি এলাকায়, গত শুক্রবারছবি: প্রথম আলো

গাছে গাছে সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুলছে গাঢ় লাল, খয়েরি ও গোলাপি রঙের লিচু। বাতাসে ভেসে আসা লিচুর মিষ্টি সুবাস আর রোদ-ছায়ার খেলায় ফলগুলো যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। মৌসুমের এই সময়ে লিচুবাগান শুধু একটি ফলের বাগান নয়, বরং গ্রামবাংলার সৌন্দর্য, কৃষকের স্বপ্ন আর প্রকৃতির উদারতার প্রতীক।

লিচুর রাজধানীখ্যাত দিনাজপুর জেলার প্রায় সব এলাকাতেই কমবেশি লিচুর চাষ হয়। তবে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় সদর উপজেলার মাসিমপুর, ঘুঘুডাঙ্গা, উলিপুর, বিরলের মাধববাটি, করলা, রবিপুর, মহেশপুর, বটহাট, খানসামার গোলাপগঞ্জ, কাচিনীয়া, বীরগঞ্জের সনকা এবং চিরিরবন্দরের কারেন্টহাট এলাকায়। মাদ্রাজি, বেদানা, বোম্বাই, চায়না–থ্রি, মোজাফফরি, কাঁঠালিসহ বিভিন্ন জাতের লিচুর আবাদ হলেও বোম্বাই-বেদানারই আধিক্য।

দিনাজপুরে রয়েছে লিচু চাষের উপযোগী বেলে-দোআঁশ মাটি। লাভজনক হওয়ায় এ অঞ্চলে লিচুর আবাদ বেশ জনপ্রিয়। গত বছর ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে দিনাজপুরের বেদানা লিচু। সুমিষ্ট, রসালো ও স্বাদে ভরা দিনাজপুরের লিচুর খ্যাতি এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। তবে চাষিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া গর্বের বিষয়। শুধু স্বীকৃতিতেই সীমাবদ্ধ থাকা যাবে না। অধিক পরিমাণে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি।

চাষিরা বলছেন, উনিশ শতকের শেষ দিকে এ জেলায় লিচুর আবাদ শুরু হয়। স্থানীয় জমিদার ও ব্রিটিশ শাসকেরা এ অঞ্চলে লিচুর আবাদ শুরু করেছিলেন। ভারতের মাদ্রাজ ও বোম্বাই অঞ্চল থেকে লিচুর চারা এনে রোপণ করেছিলেন তাঁরা। তবে জেলায় বেদানা ও চায়না–থ্রি লিচুর বাণিজ্যিক আবাদ শুরু হয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ বছর আগে।

রসালো ও মিষ্টত্বের কারণে দিনাজপুরের লিচুর আলাদা সুনাম রয়েছে
ছবি: প্রথম আলো

দিনাজপুরের উলিপুর এলাকার আব্বাস আলী (৫২) বলছিলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকে লিচুর বাগান দেখে আসছি। পুরোনো গাছ কেটে দিয়ে নতুন বাগান করেছি।’ স্মৃতি হিসেবে ঘরের কোনায় দাদার আমলের একটি মাদ্রাজি লিচুর গাছ রেখে দিয়েছেন বলে জানালেন এই চাষি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, জেলায় ৫ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমিতে লিচুর বাগান রয়েছে। এবার উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৭ হাজার ৫৯৩ মেট্রিক টন। সবচেয়ে বেশি ৩ হাজার ২২৫ হেক্টর জমিতে আছে ‘বোম্বাই’ জাতের লিচু। এ ছাড়া মাদ্রাজি ১ হাজার ৮৯, বেদানা ৩০৮, চায়না–থ্রি ৭১১, চায়না-টু ১৩২, কাঁঠালি ২৪ এবং মোজাফফরি লিচুর বাগান আছে ১ হেক্টর জমিতে। আর বসতবাড়ির উঠানসহ বাগানগুলোতে গাছ রয়েছে সাত লক্ষাধিক।

মাদ্রাজি দিয়ে শুরু

মৌসুমের শুরুতে বাজারে আসে মাদ্রাজি জাতের লিচু। এবারও মে মাসের শেষ দুই সপ্তাহ এই জাতের লিচুর দেখা মিলেছে। এর আঁটি বড় হয়। দেখতে লম্বা আকৃতির। নিচের দিকে সরু। খোসা খানিকটা পুরু ও শক্ত। পরিপক্ব লিচুর স্বাদ মিষ্টি ও ঘ্রাণযুক্ত হয়। এরপরেই দেখা মেলে সবচেয়ে জনপ্রিয় লিচু ‘বেদানা’। দেখতে গোলাকার। লাল, খয়েরি রঙের এই লিচুর খোসা পাতলা। এর আঁটি আকারে ছোট, শাঁস বড়। অনেক বেশি রসালো ও মিষ্টি।

প্রায় একই সময়ে বাজারে আসে বোম্বাই, চায়না–থ্রি, চায়না–টু জাতের লিচু। বোম্বাই দেখতে লম্বা আকৃতির। উজ্জ্বল গোলাপি রঙের। শাঁস রসালো ও সুঘ্রাণযুক্ত। চায়না–থ্রি আকারে বড়। দেখতে অনেকটা আপেল আকৃতির। আঁটি ছোট হয়, শাঁস অনেক বেশি থাকে এবং রসালো হয়। অভিজাত শ্রেণির লিচু হিসেবেও পরিচিতি আছে চায়না–থ্রির। আর মৌসুম শেষে আসে কাঁঠালি ও মোজাফফরি জাতের লিচু।

ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাক

প্রতিবছরের মতো এবারও শহরের কালীতলা নিউমার্কেটে (ফল মার্কেট) ভোর হতে অনেক রাত অবধি চলছে লিচু ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাক। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকারেরা লিচু কিনতে এসেছেন। ট্রাকে করে সেই লিচু পাঠাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়। অনেকে বাঁশের খাঁচা ও ক্রেটে ভরে কুরিয়ারযোগে লিচুপ্রেমী বন্ধুবান্ধব ও স্বজনদের কাছেও পাঠাচ্ছেন উপহার হিসেবে। কয়েকজন চাষি ও ব্যবসায়ী বলছেন, এবার প্রতি এক হাজার মাদ্রাজি লিচু মানভেদে বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দরে। বেদানা লিচু (প্রতি হাজার) ৪ হাজার থেকে ৮ হাজার এবং চায়না–থ্রি বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা দরে।

বিদেশেও যাচ্ছে দিনাজপুরের রসালো লিচু। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো একটি প্রতিষ্ঠান ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসে লিচু রপ্তানি করেছিল। পরের বছর ইংল্যান্ডে রপ্তানি হয়েছিল প্রায় ১২ হাজার পিস লিচু।

দরকার আরও গবেষণা

অবশ্য লিচু নিয়ে গবেষণা করছে বাংলাদেশ ফল গবেষণা ইনস্টিটিউট। এরই মধ্যে বারি-১ থেকে বারি-৫ মোট পাঁচটি লিচুর নতুন জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। একই সঙ্গে বারি-৩ ও বারি-৪ লিচু দিনাজপুর অঞ্চলের মাটির জন্য উপযোগী জাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড প্রসে‌সিং অ্যান্ড প্রিজার‌ভেশন বিভাগের অধ্যাপক মারুফ আহমেদ জানালেন, তাঁরা বেদানা লিচুর পুষ্টিগুণ নির্ণয়ে কাজ করছেন। স্বল্প‌মেয়াদকালীন ফলটির দীর্ঘ‌মেয়া‌দে পাল্প সংরক্ষ‌ণেও গ‌বেষণা কর‌ছেন।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বাগানের বয়স বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে উৎপাদন ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বলছিলেন দিনাজপুর সরকা‌রি ক‌লে‌জের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও লেখক জ‌লিল আহ‌মেদ। তাঁর অভিমত, নতুন জাত উদ্ভাবন, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারণে গবেষণা ও বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। তবেই দিনাজপুরের রসালো লিচুর ঐতিহ্য আরও সুদৃঢ় হবে।