ছোট ‘ছুয়ার’ মতো যত্ন লাগে ‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড’ পেঁয়াজবীজের খেতে

পেঁয়াজ ফুলে হাত দিয়ে পরাগায়ন করছেন শ্রমিকেরা। সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মথুরাপুর এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

সড়কের পাশে দিগন্তজোড়া মাঠ। সেখানে দুলছে সাদা সাদা ফুল। এগুলো পেঁয়াজের ফুল। ফুলগুলো শুকিয়ে গেলে ভেতর থেকে বের হয় কুচকুচে কালো বীজ। বাজারে চড়া দামের কারণে কৃষকেরা এই বীজকে বলেন ‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড’ বা কালো সোনা। অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হওয়ায় ঠাকুরগাঁওয়ে পেঁয়াজবীজ উৎপাদনে কৃষকের আগ্রহ বেড়েছে। প্রতিবছরই বাড়ছে এর আবাদ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ মৌসুমে জেলায় ১১৯ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজবীজ আবাদ করা হয়েছিল। ২০২৩-২৪ মৌসুমে তা বেড়ে হয় ১২২ হেক্টর। ওই মৌসুমে উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৯৮ টন বীজ। ২০২৪-২৫ মৌসুমে ৫৪৭ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়ে উৎপাদন পেঁয়াজবীজ পাওয়া যায় ১ হাজার ৩৯ টন। আর চলতি মৌসুমে আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১২৫ হেক্টরে। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৩৭ দশমিক ৫ টন। গত মৌসুমে প্রতি কেজি পেঁয়াজবীজ দুই হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। সেই হিসাবে এ বছর জেলায় প্রায় ২৪৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার পেঁয়াজবীজ উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।

পেঁয়াজবীজ এখন ব্ল্যাক ডায়মন্ডের মতো। প্রতিবছরই আবাদ বাড়ছে। আমি আগামী মৌসুমে আরও এক একর জমিতে চাষের পরিকল্পনা করছি।
অশোক বর্মণ, পেঁয়াজবীজ চাষি

সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পেঁয়াজবীজের চাষ শুরু হয়। আর ২৫ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে বীজ সংগ্রহ করা হয়।

কৃষকেরা বলছেন, কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে মৌমাছিসহ উপকারী পোকা কমে যাওয়ায় পেঁয়াজখেতে স্বাভাবিক পরাগায়ন ব্যাহত হচ্ছে। তাই এখন অনেক চাষি কৃত্রিম বা হস্তপরাগায়নের ওপর নির্ভর করছেন। হাত দিয়ে পুরুষ ফুলের পরাগরেণু স্ত্রী ফুলে স্থাপন করে এই পরাগায়ন করা হয়।

সম্প্রতি সদর উপজেলার বরুণাগাঁও, আখানগর, মথুরাপুর, বালিয়াডাঙ্গীর চাড়োল ও ধনতলা এবং রানীশংকৈলের বনগাঁও এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে পেঁয়াজবীজের খেত। নারী-পুরুষ শ্রমিকেরা সারা দিন হাতে ফুল নাড়িয়ে পরাগায়ন করছেন।

রানীশংকৈলের বনগাঁও গ্রামের কৃষক পয়গাম আলী বলেন, বাজারে পেঁয়াজবীজের দাম বেশি। তাই এটা এখন সোনা চাষের মতো মনে হয়। কয়েক বছর ধরে চাষিরা এদিকে ঝুঁকছেন। প্রতিবিঘা জমিতে ১৫০ থেকে ১৬০ কেজি বীজ উৎপাদিত হবে বলে তিনি আশা করছেন।

বালিয়াডাঙ্গীর ধনতলা গ্রামের চাষি অশোক বর্মণ বলেন, ‘পেঁয়াজবীজ এখন ব্ল্যাক ডায়মন্ডের মতো। প্রতিবছরই আবাদ বাড়ছে। আমি আগামী মৌসুমে আরও এক একর জমিতে চাষের পরিকল্পনা করছি।’

পেঁয়াজ ফুলে পরাগায়নের কাজ করতে হয় অত্যন্ত যত্নসহকারে
ছবি: প্রথম আলো

সদর উপজেলার মথুরাপুর এলাকার চাষি আবু সুফিয়ান পাঁচ একর জমিতে পেঁয়াজবীজ আবাদ করেছেন। তাঁর খেতে পরাগায়নের জন্য ৩৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন। তাঁদের একজন শ্রমিক সুমিত্রা রানী। তিনি বলেন, ‘ছোট ছুয়ার (শিশু) মতো যত্ন করা নাগে পেঁয়াজবীজ খেতের। ছুয়ালার যেমন একটুতেই সর্দি-জ্বর লাগি যায়, তেমনি বীজ খেতেও রোগ হয়। ঠিকমতো না নাড়িলে ফুলে বীজ হবেনি।’

পরাগায়নের কাজে একজন নতুন শ্রমিক এসেছেন। জয়ন্তী রানী তাঁকে কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছেন। জয়ন্তী রানী বলছেন, ‘ছুয়ালার মাথায় যেমন করি তেল দেন, পেঁয়াজ ফুললাও ওমন করিয়া নাড়িবা হবে।’

আবু সুফিয়ান বলেন, পেঁয়াজবীজ চাষে লাভ বেশি হলেও ঝুঁকিও কম নয়। ২৫ থেকে ৩০ দিন হাতে পরাগায়ন করতে হয়। ভালো পরাগায়ন হলে প্রতি শতাংশে পাঁচ কেজি পর্যন্ত বীজ পাওয়া যায়। একরে খরচ হয় প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা, আর বিক্রি হয় সাত থেকে আট লাখ টাকার বীজ। তবে রোগ লাগলে পুরো খেত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এবার ঘন ঘন বৃষ্টির কারণে খরচ বেড়ে গেছে।

সুফিয়ানের খেতে পেঁয়াজ ফুলের পরাগায়নের কাজ করেন স্থানীয় কলেজশিক্ষার্থী স্বাধীন রায়। তিনি বলেন, ‘এলাকায় অনেকেই পেঁয়াজবীজ উৎপাদন করছেন। তাঁদের খেতে আমরা কাজ করি। কাজটিও খুব কষ্টের নয়। প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা মজুরি পাওয়া যায়।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম জানান, পেঁয়াজ ফুলের প্রধান পরাগবাহক মৌমাছি। কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারে মৌমাছি কমে যাওয়ায় প্রভাব পড়ছে। তবে কৃষকেরা কৃত্রিম পরাগায়নের মাধ্যমে সেই ঘাটতি অনেকটা পূরণ করছেন। এভাবে পেঁয়াজবীজ চাষে অনেক কৃষক সফল হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘উৎপাদন বাড়াতে আমরা নানা উদ্যোগ নিয়েছি। উৎপাদন বাড়লে কৃষকের আয়ও বাড়বে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’