শেরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পুরো চত্বরই ছিমছাম আর গোছানো। প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ভেতরে রয়েছে ডিজিটাল বোর্ড। প্রয়োজনীয় সেবা নিতে খরচের তালিকা থেকে শুরু করে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং কর্মীদের মুঠোফোন নম্বর—সব তথ্য আছে ওই বোর্ডে। নিচতলার বারান্দায় ওঠার আগেই অভ্যর্থনা জানাবে স্যানিটাইজার জোন ও হাত ধোয়ার বেসিন। বারান্দায় উঠতেই হাতের বাঁ পাশে ‘সেবা সহজীকরণ’ হেল্প ডেস্ক। এর পাশে সেবাপ্রত্যাশী নারীদের জন্য ‘ফিডিং কর্নার’ এবং ‘দুস্থ, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী কর্নার’।

দোতলার একটি কক্ষে আছে ‘প্রাণিসম্পদ ইনফো অ্যান্ড মিডিয়া গ্যালারি’ ও ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’। সেখানে একনজরে উপজেলার প্রাণিসম্পদের সব তথ্য লেখা আছে একটি বোর্ডে। পুরো দপ্তর সংযুক্ত করা হয়েছে ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনায়। দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, প্রতিদিন সকালে এখানে দাপ্তরিক কর্মকাণ্ড শুরু হয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংক্ষিপ্ত সভার মধ্য দিয়ে। পাঁচ মিনিটের ওই সভায় কর্মকর্তা–কর্মচারীরা সংক্ষিপ্তভাবে দিনের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন।

খামারিদের কথা

প্রতিদিন শেরপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে খামারিরা এখানে সেবা নিতে আসেন। গত ২৫ অক্টোবর শেরপুর ভেটেরিনারি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শেরপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের সালফা গ্রামের খামারি আল আমিন এক মাস বয়সী বাছুরের চিকিৎসার জন্য এসেছেন। তিনি বলেন, এলাকার পশুচিকিৎসককে দিয়ে চিকিৎসা করিয়েও কাজ হয়নি। পরে প্রতিবেশীদের পরামর্শে তিনি এই হাসপাতালে এসেছেন। প্রাণিচিকিৎসক ও কর্মচারীদের সেবায় তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।

একই উপজেলার শাহ বন্দেগী ইউনিয়নের পশ্চিম ফুলতলা গ্রাম থেকে আসা খামারি আনোয়ার হোসেন বলেন, এখানে আগেও অসুস্থ গরু নিয়ে তিনি চিকিৎসার জন্য এসেছেন। তবে আগে এখানকার পরিবেশ এত সুন্দর ছিল না। এখন সেবার মান বেড়েছে। পরিপাটিভাবে সাজানো এই হাসপাতালে এলেই মন ভালো হয়ে যায়। পশু হাসপাতালে আছে ভ্যাকসিন কর্নার। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, খামারিদের উপচে পড়া ভিড়। মুরগির ভ্যাকসিন দিতে আসা খামারি এস এম আল নাহিয়ান বলেন, এখানে নামমাত্র মূল্যে হাঁস–মুরগি, কোয়েল পাখি, কবুতর, গরু-ছাগলসহ সব প্রাণীকে টিকা দেওয়া যায়। বাইরে এ টিকার দাম বেশি। কাজও কম হয়।

বদলের নেপথ্যে

গত বছরের ১৯ অক্টোবর মো. রায়হান এখানে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার দায়িত্বে আসেন। তিনি যোগদানের পর প্রায় এক বছরে দপ্তরের দৃশ্য ও দৈনন্দিন কার্যক্রমে অনেক পরিবর্তন এসেছে। রায়হান বলেন, ‘সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং এখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের চেষ্টা করছি। এখানকার অভিযোগ বাক্সটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং অভিযোগের বিষয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ ছাড়া নিয়মিত খামারি সমাবেশ ও কর্মকর্তাদের সভা করা হয়। অভ্যন্তরীণ সভায় অফিস সহায়ক থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সবার মতামতকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।’

নান্দনিকভাবে পুরো দপ্তরকে সাজানোর ব্যাপারে রায়হান বলেন, আগে হাসপাতালে সেবা নিতে আসা খামারিদের জন্য বসার পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না। চত্বরের এক পাশে গরু-ছাগল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁরা নিজেরাও অসুস্থ হয়ে পড়তেন। সেবাও ঠিকমতো মিলত না। আবার টিকার দাম বেশি নেওয়ার অভিযোগও ছিল। তবে এখন সেবার বিপরীতে সরকারি খরচের তালিকা ঝুলিয়ে দেওয়া আছে। খামারিদের জন্য বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অসুস্থ গরু-ছাগলের চিকিৎসার জন্য শেডও বানানো হয়েছে।

ইতিমধ্যে বদলে যাওয়া এই দপ্তরের কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন সরকারের উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তা। এখানকার সৃজনশীল নানা উদ্যোগ এবং ‘অ্যানুয়াল পারফরম্যান্স অ্যাগ্রিমেন্ট’, জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়ন এবং সেবা সহজীকরণ কার্যক্রম পরিদর্শনে এসেছে বনিয়াদি প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া বিসিএস ক্যাডারদের একাধিক ব্যাচ।

সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এই প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও হাসপাতাল ঘুরে দেখে পরিদর্শকদের মতামতের বইয়ে লিখেছেন, ‘এই দপ্তরের কার্যক্রম সরকারি সব দপ্তর অনুসরণ করুক।’

বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি খ্রিস্টিয়ান বার্গার একই বইয়ে লিখেছেন, ‘সেবা সহজীকরণ কার্যক্রম এবং অভিযোগ ও প্রতিকারের এ অনন্য দৃষ্টান্ত সরকারি অন্য দপ্তরের জন্য মডেল হতে পারে।’