চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার জোররগঞ্জ ইউনিয়নের উত্তর সোনাপাহাড় এলাকার কৃষক নজির আহমদের বয়স ৬০ বছর। পাঁচ সন্তানের জনক নজির আহমদ চার দশক ধরে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। বর্গা ও ইজারা মিলে বাড়ির আশপাশের দেড় একর জমিতে ধানসহ বিভিন্ন চাষাবাদ করে সংসার চলে তাঁর। নির্বাচন নিয়ে এই কৃষকের প্রত্যাশা, ভোটের মধ্য দিয়ে দেশে যেন শান্তি ফিরে আসে। সার-কীটনাশকের দাম সহনীয় থাকে আর ধানের দাম যৌক্তিক হয়। একই সঙ্গে কৃষিঋণ সহজলভ্য করার দাবি তাঁর।
উপজেলার সর্ব উত্তরের ইউনিয়ন করেরহাট। পাহাড় সমতল মিলিয়ে ফেনী নদীর পাড়ে ভারত সীমান্তের এই ইউনিয়নের ঘেড়ামারা আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা আলেয়া বেগম। গৃহিণী আলেয়া হাঁস-মুরগি পালন ও পাহাড় ঘুরে রান্নার জ্বালানি সংগ্রহের মাধ্যমে অবদান রাখেন সংসারে। নির্বাচন নিয়ে এ নারীর ভাবনা একেবারেই সাদামাটা। তিনি বলেন, দেশের নাগরিক হিসেবে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেবেন তিনি। আলেয়া বলেন, ‘এবার ভোটের জমজমাট প্রচারণায় চারদিক মুখর। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, আমরা চাই হানাহানি মুক্ত দেশ। আর চাল, ডাল, তেলের দাম যেন সহনীয় থাকে। খেয়ে–পরে যাতে নিরাপদে বেঁচে থাকা যায়।’
পাহাড়, সমুদ্র, নদী আর উর্বর সমতলভূমি নিয়ে মিরসরাই উপজেলার আয়তন ৫০৯ বর্গ কিলোমিটার। এই উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার একর জমিতে গড়ে ওঠা জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য দেশ ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত উপজেলাটি। তাই এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) সংসদীয় আসনটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। নজির আহমদ কিংবা আলেয়া বেগমের মতো ভোটারদের মন জয় করতে ভোটের মাঠে ছুটে বেড়াচ্ছেন প্রার্থীরা। তবে এই আসনে এবার মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মধ্যে। মাঠের প্রচারণায় সমানে সমান হলেও এবার এই আসনে জয় পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দেবে সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট। রাজনীতি–সচেতন মানুষেরা বলছেন এই দুই পক্ষের মানুষের ভোট যাদের বাক্সে যাবে, তারাই জয় পাবে।
ভোটের মাঠে ঐক্যবদ্ধ বিএনপি
এবারের নির্বাচনে মিরসরাই আসনে জিততে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচারে নেমেছে বিএনপির নেতা-কর্মীরা। এই ঐক্যই ভোটের মাঠে তাদের বড় শক্তি হিসেবে কাজ করবে বলে জানান বিএনপি নেতারা। এই আসনে মনোনয়ন নিয়ে উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক শাহিদুল ইসলাম চৌধুরী ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আমিনের অনুসারীদের মধ্যে বিভক্তি ছিল। তবে নুরুল আমিন চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়ার পর দলের নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভোটারদের মন জয় করতে এখন দিন–রাত প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন বিএনপির প্রার্থী নুরুল আমিন। হাটবাজার, গ্রামে সভা, সমাবেশ, উঠান বৈঠক করছেন তিনি। সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজমুক্ত, বৈষম্যহীন মিরসরাই গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তিনি।
জানতে চাইলে বিএনপির প্রার্থী নুরুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘নির্বাচনের মাঠে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন আর বিএনপির নেতা-কর্মীদের দৃঢ় ঐক্য আমাদের বড় শক্তির জায়গা। নির্বাচনে জয়লাভ করলে মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা হবে আমাদের প্রধান কাজ। মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মাধ্যমে মিরসরাইয়ের মানুষের উন্নয়নসহ মাদকমুক্ত মিরসরাই গড়ে তুলব আমরা। আমাদের বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতিতে মানুষ আস্থা রাখছে। দিকে দিকে ধানের শীষের পক্ষে যে গণজোয়ার উঠেছে, তাতে বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত।’
ভোটারদের দ্বারে দ্বারে জামায়াত
মিরসরাই নির্বাচনী আসনে এখন প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. সাইফুর রহমান ও তাঁর কর্মী সমর্থকেরা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সভা–সমাবেশ, মিছিল ও মাইকিং করে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে ভোট চাইছেন তাঁরা। আগের নির্বাচনগুলোয় এই আসনে দাঁড়িপাল্লার প্রতীকের প্রার্থী শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে না পারলেও নির্বাচনে এবার আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে পরিস্থিতি ভিন্ন। এ কারণে এই আসনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী দলটির প্রার্থী ও কর্মী–সমর্থকেরা।
জামায়াতের প্রার্থী মো. সাইফুর রহমান বলেন, ‘আমরা মিরসরাইয়ের মানুষের আস্থা বিশ্বাস ও ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। নির্বাচনের মাঠে বিজয় অর্জনে এটি আমাদের বড় শক্তির জায়গা।’
এই প্রার্থী আরও বলেন, ‘মিরসরাইয়ের যোগ্য নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। বিজয়ী হলে আমাদের লিডারশিপ সেই শূন্যতা পূরণ করবে, তা ছাড়া অবকাঠামো উন্নয়নে সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে আমাদের। মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল সচল রাখতে আমাদের ভূমিকা থাকবে অগ্রণী। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের মাধ্যমে মিরসরাইয়ের জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে কাজ করব আমরা। এই উপজেলায় বিগত সময়ে সন্ত্রাস প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। সন্ত্রাসমুক্ত মিরসরাই গড়তে যা যা করা দরকার, আমরা তার সবই করব। যুবকদের কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা, সব শ্রেণির মানুষের চিকিৎসার সুযোগ তৈরি ও শিক্ষার সর্বাত্মক প্রসার এবং পাহাড়–সমুদ্র মিলিয়ে মিরসরাইয়ে পর্যটনের যে অপার সম্ভাবনা, সেটি কাজে লাগাব আমরা। আগের শাসকদের দুঃশাসন ভুলে মানুষ এবার দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিতে মুখিয়ে আছে। আমরা বিজয়ী হব ইনশা আল্লাহ।’
বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীসহ মিরসরাইয়ে এবার ৭ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থী বাদে এ আসনে নির্বাচন করছেন পাঞ্জা প্রতীক নিয়ে মুসলিম লীগের প্রার্থী জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী, হাতপাখা প্রতীক নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ফেরদৌস আহমেদ চৌধুরী, তারা প্রতীক নিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) এ কে এম আবু ইউসুফ, আপেল প্রতীক নিয়ে ইনসানিয়াত বিপ্লবের রেজাউল করিম ও লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে জাতীয় পার্টির সৈয়দ শাহাদাত হোসেন।
মিরসরাই আসনে এবার ভোটারের সংখ্যা ৩ লাখ ৮০ হাজার ২০২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৬৭ জন। নারী ভোটার ১ লাখ ৮৬ হাজার ৩৩১ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার চারজন। এই আসনে পোস্টাল ভোটসংখ্যা ৬ হাজার ৫৭২টি। উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের ১০৬টি ভোটকেন্দ্রের ৭১৮টি কক্ষে ভোট গ্রহণ করা হবে। এরই মধ্যে সব কেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপনসহ সব রকম নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণে কাজ করছে প্রশাসন।