রেজাউলের বাড়িটি যেন উদ্যান, আছে ৫০ জাতের আম, ২০ জাতের আঙুরের গাছ
অনুচ্চ টিলার মধ্যে একটি বাড়ি। প্রাকৃতিকভাবে এলাকাটি অনেকটা সবুজ, কিছুটা অরণ্য মতো। এক ‘শৌখিন চাষি’র উদ্যোগ, পরিচর্যায় প্রকৃতির মধ্যে ঠাঁই নেওয়া সেই বাড়ি এখন দেশি-বিদেশি দুর্লভ সব ফল-ফুলের এক মায়াবী উদ্যান হয়ে উঠেছে।
দেশের নানা জায়গা থেকে তো আছেই, নানা দেশ থেকেও সংগ্রহ করা নতুন নতুন ফলগাছের সমাবেশ বাড়ছে এই বাড়িতে। প্রতিবছরই বাড়ছে ফল ও ফুলের জাত। শতাধিক জাতের ফল বাড়িটিকে অন্য সব বাড়ি থেকে আলাদা করে তুলেছে।
বাড়িটির অবস্থান মৌলভীবাজারের সীমান্তবর্তী এক প্রান্তে, বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের সরিয়া গ্রামে। আর বাড়িটির শৌখিন চাষি হচ্ছেন রেজাউল করিম খন্দকার। তিনি একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের ফাঁকেই শখের বশে চলে বৃক্ষপ্রেম।
আম দিয়ে শুরু
বাড়ির প্রায় দুই একরের বাগানটিতে আম দিয়ে সূচনা হয়েছিল ফল চাষের। এখন আমই আছে ৫০ জাতের। ২০ জাতের আঙুর, ২০ জাতের লংগান (কাঠলিচু), দেশে অপরিচিত আমেরিকান হানি কাপোয়ার্ড, চুপাচুপাসহ অনেক দুর্লভ ফলের বাস এখন এই বাড়িতে।
রেজাউল করিম খন্দকার বলেন, তিনি একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। দিনের বেশির ভাগ সময় ওই প্রতিষ্ঠানের কাজেই কাটে। গাছপালা, ফল-ফুল তাঁকে টানে। হয় তো এসব কারণে বাড়িটিকে ফল-ফুলে সাজিয়ে তোলার ইচ্ছাটা তাঁর মনের মধ্যে চাপা ছিল। কাজের অবসরে এই ফল-ফুল তাঁকে আলোড়িত করত। ২০১৭ সালে শখ থেকেই বাড়িসংলগ্ন একটি টিলায় কিছু আমের চারা রোপণের মাধ্যমে তাঁর আড়াল পড়া ইচ্ছাগুলো সামনে চলে আসে। আমগাছে ভালো ফলন হয়। এতে অন্য ফলের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়।
পরিবারের চাহিদা মিটাতে আমের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের ফলগাছ লাগানো শুরু করেন রেজাউল। সব ধরনের ফলগাছেই কমবেশি ফলন হয়। ফলের প্রতি তাঁর আগ্রহ বেড়ে যায়। দেশি ফলের পাশাপাশি বিদেশি ফল দিয়ে ভরতে থাকেন উদ্যানটি। প্রায় দুই একরের এই টিলাভূমি এখন দেশি-বিদেশি শতাধিক জাতের ফলে সমৃদ্ধ এক দুর্লভ উদ্যান হয়ে উঠেছে। সঙ্গে আছে নানা জাতের ফুলের গাছ, স্থানীয়ভাবে অপ্রচলিত নানা জাতের সবজি। নিজের আনন্দ, অন্যের আনন্দের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে বাড়িটি।
রেজাউল করিম খন্দকার একজন শৌখিন চাষি। তিনি বিদেশি বিভিন্ন জাতের গাছ সংগ্রহ করেন এবং খুব ভালোভাবে এগুলোর পরিচর্যা করেন। উদ্যোগটা খুবই ভালো।
দেশি-বিদেশি ফল–ফুলে ভরা
বাড়িটির যেদিকে তাকানো যায়, কোনো না কোনো ফলগাছ হাতছানি দিয়ে ডাকে। অনেক গাছেরই জাত-পরিচয় গাছের গায়ে ঝোলানো আছে। কোথাও আমগাছের সারি, কোথাও আঙুরের মাচা, কোথাও স্ট্রবেরি, কোথাও নাশপাতি, কোথাও পিসফল—দেশি-বিদেশি নাম জানা, নাম অজানা ফল এখন বাড়িটিতে রাজত্ব করছে। আর তাদের পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকেন রেজাউল করিম খন্দকার।
এই বাগানে আমের জাতের মধ্যে আছে আলফানসো, আমেরিকান কেন্ট, হিমসাগর, চেংমাই, পাকিস্তানি চোষা, আমেরিকা পালমা, সামার বেহেশত, বৈশাখী, বান্দি নুড়ি, গৌরমতি, কাটিমন, থাই কাঁচামিঠা, কুনাই, বাউ-৩, বারি-১১, নাম ডাক মাই, হাড়িভাঙা, ব্ল্যাকস্টোন, মহাচনক, কিউজাই, ব্রুনাই কিং, ব্যানানা, আম্রপালি, সুপার ভাগোয়া ইত্যাদি।
২০ জাতের আঙুরের মধ্যে আছে গ্রিল লং, এলিস, ফ্যান্টাসি, বাইকুলুর, জয়, ভিতুবি ব্ল্যাক, এবিউ জায়ান্ট ইত্যাদি। ১০ জাতের কমলা ও মাল্টার মধ্যে আছে হানিডিউ, কমলা তারাক্ক, রুপি গ্রাপ, কারা কারা অরেঞ্জ, ওয়াশিংটন নেভাল, হেয়ার লুম নেভাল, সাউথ আফ্রিকান হলুম মাল্টা, চায়না কমলা, সিলেটি কমলা ও থাই-২।
বিভিন্ন জাতের ফলগাছ দেখে চোখ-মন দুটোই ভরে যায়। তিনি যে যত্ন, মনোযোগ ও ধৈর্য নিয়ে বাগানটি গড়ে তুলেছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয়।
দেশি-বিদেশি অন্যান্য ফলের মধ্যে আছে আনার, ফুলে আরাকতা (ডালিম), মৃদুলা (ডালিম), আপেল, পারসিমন, নাশপাতি, ড্রাগন ফল, ত্বিন ফল, ব্ল্যাকবেরি, লুকাট ফল, পেয়ারা, স্ট্রবেরি, রামবুটান, সালাক ফল, জামরুল, গোলাপজাম, তুরকি মালবেরি, লেবু, কাজুবাদাম, ফিলিপাইন আখ, আতাফল, শরিফা, এলোনা ইস্পানিশ, আফ্রিকান রেড পিচ, জায়ান্ট এবিও, নাশপাতি, ব্রাজিল পেয়ারা, হানি কামকুয়াট, পেঁপে, জুজাবি ফল—আরও কত কী!
রেজাউল করিম বাগানে বিটরুট, চায়না গাজর, ব্ল্যাক টমেটো, তরমুজ, লাল মুলা, স্ট্রবেরি টমেটো, চেরি টমেটো ও ক্যাপসিকাম প্রভৃতির আবাদ করেন। বেশ কিছু জাতের মরিচও আছে।
ঘুরতে আসেন অনেকে
বাড়ি ও বাগানের সৌন্দর্য বাড়াতে বিভিন্ন জাতের ফুলও লাগিয়েছেন রেজাউল। এই বাগান দেখতে অনেকে আসেন। এমন একজন এ জে লাভলু প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ধরনের ফল বাগান আমাদের এলাকায় আগে কখনো দেখিনি। বিভিন্ন জাতের ফলগাছ দেখে চোখ-মন দুটোই ভরে যায়। তিনি যে যত্ন, মনোযোগ ও ধৈর্য নিয়ে বাগানটি গড়ে তুলেছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয়। অনেকের কাছে তিনি এখন অনুপ্রেরণা।’
রেজাউল করিম খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, হানি কাপোয়ার্ড ও চুপাচুপা—এই দুটি ফলের চারা ইন্দোনেশিয়া থেকে আনিয়েছেন। হানি কাপোয়ার্ড অনেকটা লিচুর মতো, খেতে সুস্বাদু। পাকলে জেলির মতো হয়ে যায়। চুপাচুপাও মিষ্টি একটি ফল। দেশি ফল দেশের বিভিন্ন নার্সারি থেকে সংগ্রহ করেন। বিদেশিগুলো সরাসরি বিদেশ থেকে সংগ্রহ করেন। এই ফলবাগান সাজাতে তাঁর এ পর্যন্ত আড়াই লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে।
বাণিজ্যিকভাবে ফল চাষের পরিকল্পনা আছে বলে জানালেন রেজাউল। তিনি বলেন, ‘শখ থেকে আম দিয়ে ফল রোপণ শুরু করেছিলাম। এখন প্রতিবছরই নতুন নতুন ফল আসছে। প্রচুর পরিচর্যা লাগে। এখনো বাণিজ্যিকভাবে শুরু করিনি। বাংলাদেশের মাটিতে কী কী বিদেশি ফল হয়, পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করে দেখছি। ইচ্ছা আছে, এসব ফলের ফলন ভালো হলে পরে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করব।’
বড়লেখা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, রেজাউল করিম খন্দকার একজন শৌখিন চাষি। তিনি বিদেশি বিভিন্ন জাতের গাছ সংগ্রহ করেন এবং খুব ভালোভাবে এগুলোর পরিচর্যা করেন। উদ্যোগটা খুবই ভালো।