ছোট-বড় সবার হাতের ছোঁয়ায় একুশের আলপনা
রংতুলি হাতে ছোটাছুটি করছে ছোট-বড় সবাই। কেউ রাস্তায় তুলির আঁচড় দিতে ব্যস্ত, আবার কেউ ব্যস্ত রঙের বিন্যাসের নির্দেশনায়। এভাবে একসময় লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, কমলা রঙে সড়কজুড়ে ফুটে ওঠে আলপনা।
মহান শহীদ দিবসে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠে অবস্থিত শহীদ মিনারে যাওয়ার সড়কজুড়ে এই আলপনা আঁকা হয়েছে। এঁকেছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খুদে শিক্ষার্থীসহ নানা পেশার মানুষ।
২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারিতে ঠাকুরগাঁওয়ে শুরু হয় একুশের আলপনা আঁকা। সেদিন শহরের চিত্রশিল্পী, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরাও সাড়া দিয়ে নেমে পড়েন আলপনা আঁকায়। সবার হাতের ছোঁয়ায় একুশের আলপনার কাজটি উৎসবে পরিণত হয়। এরই ধারাবাহিকতা চলে প্রতিবছর।
আজ শুক্রবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে দেখা যায়, শহীদ মিনার ধোয়ামোছার কাজ চলছে। পাশের সড়কে শিশু–কিশোরসহ নানা বয়সের মানুষের ছোটাছুটি। তারা আলপনা আঁকছে। আলপনা আঁকার ফাঁকে ফাঁকে তাদের অনেকেই সেলফি তুলতে ব্যস্ত।
কথা হয় শহরের চিত্রশিল্পী কাদিমুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘একুশের প্রথম প্রহরে খালি পায়ে হাঁটার সময়টায় পিচঢালা সড়ক আলপনাবিহীন, এমনটা ভাবা যায় না। পথের বুকে আন্দোলনের ইতিহাস রয়েছে আমাদের, পথের এই আলপনায় ফুটে ওঠে সেই আবেগ, সেই স্মৃতি; শোককে শক্তিতে পরিণত করার সেই অনুভূতি। এই অনুভূতি থেকেই সবার হাতের ছোঁয়ায় একুশের আলপনা জীবন্ত হয়ে ওঠে।’
রংপুরে থেকে লেখাপড়া করে নুসাইবা সামিয়া। ছুটি পেয়ে সে আজ ঠাকুরগাঁওয়ে এসেছে। এসেই চলে এসেছে আলপনা আঁকতে। সে বলে, ‘যাঁদের জন্য আমরা বাংলা ভাষা পেয়েছি, তাঁদের স্মরণে এই আলপনা।’
রঙে মুখ রঙিন হয়ে গেছে মাহফুজা মারিয়া মারজানের। সে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। মারজান বলে, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি। আমার ভাইদের আমরা ভুলিনি। আজ তাঁদের আলপনা এঁকে স্মরণ করছি, কাল ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাব।’
ঠাকুরগাঁওয়ের ওয়ার্ল্ড প্লাস রেসিডেনসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ জাকির হোসেন পুরো পরিবার নিয়ে এসেছেন আলপনা আঁকার কাজে সহযোগিতা করতে। তাঁর স্ত্রী রোকসানা আক্তার মেয়ে সিদরাতুন মুনতাহাকে নিয়ে আলপনা আঁকছিলেন। আর জাকির তাঁদের নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। জাকির বললেন, ‘প্রতিবছর আমি পরিবারের সবাইকে নিয়ে এই আলপনা আঁকায় আয়োজনে যোগ দিই। যখন আলপনায় তুলির আঁচড় দিই, তখন শহীদদের মুখটা ভেসে ওঠে।’
সড়কটির পাশ দিয়ে রিকশা নিয়ে যাচ্ছিলেন চালক শহিদুল ইসলাম। আলপনা আঁকার কাজ দেখে নেমে পড়লেন তিনি। এসেই একটি রঙের কৌটা আর তুলি নিয়ে আলপনা করতে লাগলেন। শহিদুলের ভাষ্য, আলপনার কাজে হাত লাগিয়ে তিনি শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণ করলেন।
আলপনা আঁকার কাজটি দেখভাল করছিলেন রাকিবুল আলম। তিনি বললেন, একুশের চেতনা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে এই আলপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এখানে শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষ আলপনা আঁকার কাজে যোগ দেন। এই আলপনা আঁকার কাজে যাঁরা হাত বাড়িয়েছেন, তাঁরা কেউই শিল্পী নন। ভাষাশহীদদের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তাঁরা এ কাজটি করছেন।
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) নাজমুল হক বলেন, একুশের সঙ্গে আলপনার একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এখানে আরও বড় আঙ্গিকে আলপনা আঁকার আয়োজনে জেলা প্রশাসন উদ্যোগ নেবে।