অভিযানেও বন্ধ হচ্ছে না ভেজাল মসলা উৎপাদন

এবার ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযানকে নিয়মিত করেছেন। তবে ভেজাল মসলা উৎপাদিত হচ্ছে বাইরে তালা ঝুলিয়ে, গভীর রাতে।

ইটের গুঁড়া, চালের কুঁড়া আর ক্ষতিকর রং মিশিয়ে ভেজাল মসলা উৎপাদন করার অপরাধে এই কারখানা সিলগালা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত সোমবার মধ্যরাতে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে
ছবি : প্রথম আলো

ইটের গুঁড়া, চালের কুঁড়া ও ক্ষতিকর রং মিশিয়ে ভেজাল মসলা উৎপাদনের অপরাধে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পাঁচটি কারখানা সিলগালা করে দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযান এখনো চলমান রয়েছে। তবে ভেজাল মসলার উৎপাদন এতটুকুও কমেনি।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ভ্রাম্যমাণ আদালতের তৎপরতায় অসৎ ব্যবসায়ীদের কিঞ্চিৎ টনক নড়েছে বটে, তবে ভেজাল মসলার কারখানামালিকেরা এ ক্ষেত্রে নাছোড়বান্দা। উৎপাদন ধরে রাখতে তাঁরা কৌশল পাল্টেছেন। কৌশলের অংশ হিসেবে কারখানাগুলোতে এখন আর দিনের আলোতে উৎপাদন হয় না। উৎপাদন শুরু হয় রাত ১০টা থেকে, শেষ হয় ভোরে সূর্য ওঠার আগে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ কৌশলের অংশ হিসেবে কারখানার বাইরে ঝুলিয়ে রাখা হয় একাধিক তালা। তালা ঝুলিয়ে ভেতরে চলে ভেজাল মসলার উৎপাদন। প্রতিটি কারখানায় আছে জরুরি নির্গমন পথ। বিপদ বুঝলে কর্মরত ব্যক্তিরা বিকল্প পথে নিরাপদে বাইরে চলে যান।

‘বাইলে তালা, ভেতরে খোলা’ ব্যবসায়ী মহলে এমন একটি আলোচনা চাউর থাকার বিষয়টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জুলহাস হোসেনের অজানা নয়। তিনি গত সোমবার মধ্যরাতে মসলাপট্টির দুটি কারখানায় অভিযানে যান এবং এ অভিযোগের সত্যতা পান।

অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালত দেখেন, দুটি কারখানার বাইরে তিনটি করে বড় তালা ঝুলছে, তবে ভেতরে খোলা। সেখানে পুরোদমে চলছে উৎপাদন। টের পাওয়ামাত্র শ্রমিকেরা বিকল্প পথে গা ঢাকা দেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত ভেতরে গিয়ে দেখেন, এক পাশে পচা মরিচের স্তূপ, অন্য পাশে ভেজাল উপকরণ। পরে ১০ মণ পচা মরিচ জব্দ করে কারখানা ২টি সিলগালা করে দেওয়া হয়। আদালত জানতে পারেন, কারখানাটির মালিক মো. সম্রাট নামের এক ব্যক্তি। তাঁর বাড়ি পৌর শহরের ঘোড়াকান্দা এলাকায়।

জুলহাস হোসেন বলেন, মসলায় ব্যবসায়ীদের নৈতিকতার মান খুবই নিম্নমুখী। তাঁদের কারখানার মসলা খেয়ে কোনো মানুষের পক্ষে সুস্থ থাকার সুযোগ নেই।

ব্যবসায়ীরা জানান, ভৈরবে বর্তমানে অন্তত অর্ধশত ভেজাল মসলার কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় উৎপাদিত মসলার ৮০ ভাগ বাজারজাত হয় হাওরে। বাজারে নামীদামি কোম্পানির মসলার বিপরীতে ভৈরবে উৎপাদিত মসলার দাম অর্ধেক। অধিক লাভের কথা ভেবে হাওরের ব্যবসায়ীদের পছন্দ ভৈরবের মসলা। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, র‌্যাব ও উপজেলা প্রশাসন প্রায়ই ভেজাল মসলাবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে। ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানাও করা হয়। জরিমানার টাকা স্বাভাবিকভাবেই পরিশোধ করেন মালিকপক্ষ। কারণ, তাঁরা ধরেই নেন, বছরে এ ধরনের একাধিক অভিযান মোকাবিলা করতে হবে এবং জরিমানা গুনতে হবে। লাভের টাকা থেকে কেউ কেউ জরিমানার টাকা আলাদা করে রাখেন।

আগে মসলায় ভেজাল করতেন, কিন্তু এখন ছেড়ে দিয়েছেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমন কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, ভেজাল মসলায় প্রচুর লাভ। এক কিংবা দুই লাখ টাকা জরিমানা ব্যবসায়ীদের কাছে তেমন কিছু নয়। তাঁদের মতে, শুধু জরিমানা করে কোনো ভেজাল ব্যবসায়ীকে খাঁটি বানানো যাবে না। ভেজাল বন্ধ করতে নতুন কিছু ভাবতে হবে।

প্রতিটি অভিযানে প্রত্যক্ষ অংশ নেন ভৈরব পৌরসভার স্বাস্থ্য পরিদর্শক নাসিমা বেগম। তিনি বলেন, ‘ভেজালকারীরা যেন ধরেই নিয়েছে, আমাদের কাজ সময়-সময় অভিযানে যাওয়া। আর তাদের কাজ হাসিমুখে জরিমানার টাকা বুঝিয়ে দেওয়া। তা না হলে নতুন কৌশলে তো আর উৎপাদন সচল রাখত না।’