চৈত্রসংক্রান্তিতে নেত্রকোনায় শুরু হয়েছে ‘খনার মেলা’

মেলা উপভোগ করতে গতকাল থেকে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হয়েছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ও গবেষক মৌসুমী ভৌমিক ও বরেণ্য শিল্পী কফিল আহমেদছবি: প্রথম আলো

আজ বাংলা বছরের শেষ মাস চৈত্রের শেষ দিন। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে এ বছরও নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় তৃতীয়বারের মতো খনার মেলা শুরু হয়েছে। চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে গ্রামীণ সংস্কৃতি ও কৃষিতে খনার বচনের তাৎপর্য তুলে ধরতে উপজেলার আঙ্গারোয়া গ্রামে স্থানীয় কৃষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়ে মেলার আয়োজন করেছে ‘মঙ্গলঘর পরিসর’ নামের সংগঠন।

আজ সোমবার সকাল ছয়টায় ‘দুগ্ধ আশ্রম গঙ্গা বারি, এর তিন বড় উপকারী’—সমবেত সংগীতের মধ্য দিয়ে মেলা উদ্বোধন করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আজ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে আগামীকাল মঙ্গলবার পয়লা বৈশাখের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মেলার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। গ্রামীণ সংস্কৃতির পালাগান, কবিতা, বাউলগান, কিচ্ছাপালাসহ কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র মেলায় থাকছে। এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টাব্যাপী এই অনুষ্ঠানে সংগীতের বিভিন্ন ধারা, শ্লোক; খনার কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, জীবন ও জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে বিশেষ আলোচনা রয়েছে।

আয়োজনের অন্যতম সংগঠক আবুল কালাম আল আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, মেলা উপভোগ করতে গতকাল থেকে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হয়েছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ও গবেষক মৌসুমী ভৌমিক ও বরেণ্য শিল্পী কফিল আহমেদ। কফিল আহমেদের পরিচালনায় লোকগান ও পুঁথিপাঠের পাশাপাশি থাকছে জনপ্রিয় ব্যান্ড সহজিয়া, সমগীত, চিৎকার ও কৃষ্ণকলির বিশেষ পরিবেশনা। এ ছাড়া ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ, লণ্ঠন উৎসব এবং বিশেষ স্মারক ‘ভোরের হাওয়া’-র উন্মোচন করা হবে।

আবুল কালাম আল আজাদ বলেন, ‘তিন বছর আগে আঙ্গারোয়া গ্রামে আমরা এই মেলা শুরু করেছি। মেলার আয়োজন করতে পেরে আমাদের মধ্যে একধরনের নতুন অনুভূতি হচ্ছে। জনজীবনের দৈনন্দিন কার্যকলাপ, আচার-অনুষ্ঠান, কৃষি-সংস্কৃতি, সমাজের সংস্কার ও বিশ্বাস নিয়ে খনা বচন রচনা করেছেন। খনা আমাদের সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে হাজার বছর আগে কথা বলেছেন প্রবাদ-প্রবচনের মাধ্যমে। তার এই কথাগুলো আমাদের জনজীবনে এখনো তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যতিক্রমধর্মী এই মেলা উপভোগ করার জন্য সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’

আজ সকাল ছয়টার দিকে মেলায় গিয়ে দেখা গেছে, স্থানীয় কৃষক, কবি-সাহিত্যিক, শিল্পীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ মেলায় এসেছেন। স্থানীয় বাউলশিল্পী ও ছড়াকার রহমান জীবন বলেন, ‘বাংলার লোকজ ঐতিহ্য ও প্রাচীন কৃষিজ্ঞানকে ধারণ করে এই মেলাটি আমাদের অঞ্চলে তিন বছর ধরে শুরু হয়েছে। মেলা উপভোগ করতে স্থানীয় কৃষক ছাড়াও দেশ-বিদেশের শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। মেলায় কৃষিকাজে ব্যবহৃত কুলা, পাইল্লা, ধুছন, দাঁড়িপাল্লা, ধারি, মাটির কলস, মটকি, সানকি, ডোল, সিক্কা, দড়ি ছাড়াও পাট দিয়ে তৈরি করা নানা চিত্রপটসহ বিভিন্ন উপকরণ প্রদর্শন করা হয়। এ ছাড়া কৃষকেরা নিজেদের মধ্যে দেশি বীজ বিনিময় করেন। এই মেলা এখন আমাদের প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে কোথাও এমন মেলা হয় কি না আমার জানা নেই।’

নেত্রকোনার মদন উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর এলাকার কলেজশিক্ষক সানোয়ার হোসেন গতকাল রোববার রাতে মেলায় এসেছেন। আজ সকালে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি শুরু থেকেই এই মেলায় আসি। খনার মেলার ধারণাটি আমার কাছে আকর্ষণীয়। আর্থসামাজিক যে সত্যগুলো মানুষের জীবনের সঙ্গে, খাবারের সঙ্গে, আবহাওয়ার সঙ্গে জড়িত, সেগুলো খনা বলতেন। মেলায় এসে আমি খনার বচনে কৃষির অনেক নতুন বিষয় জানতে পেরেছি। এ রকম মেলার আয়োজন বিভিন্ন স্থানে আরও হওয়া উচিত।’

তৃতীয়বারের মতো শুরু হওয়া খনার মেলায় সার্বিকভাবে সহযোগিতায় রয়েছে ‘কুল এক্সপোজার’ নামের মিডিয়া কমিউনিকেশন প্রতিষ্ঠান।