তিন মণ ধান বিক্রি করে মেয়ের জন্য একটি ইলিশ কিনেছেন কৃষক মো. হাসান

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার হাজীমারা মাছঘাট এলাকায় বিক্রির জন্য আনা হয়েছে ইলিশ মাছ। গত শনিবার সকালে তোলাছবি: প্রথম আলো

লক্ষ্মীপুর সদরের হামছাদী গ্রামের কৃষক মো. হাসানের মেয়ে বহুদিন পর শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার কাছে বেড়াতে এসেছেন। মেয়ে ঢাকায় থাকেন। লক্ষ্মীপুরের বিখ্যাত ইলিশের স্বাদ নেওয়া হয় না তাঁর। এ জন্য মেয়ে এলে ইলিশ কিনবেন বলে ঠিক করে রেখেছিলেন মো. হাসান। ইলিশ কেনার জন্য হাটে ৩ মণ ধান বিক্রি করেছেন তিনি ৩ হাজার ৫০০ টাকায়। সেই টাকা থেকে মেয়ের জন্য ১ কেজি ওজনের ১টি ইলিশ মাছ কিনেছেন ২ হাজার ৮০০ দিয়ে। এই বছর প্রথম ইলিশ মাছ কিনেছেন বলে জানান তিনি।

শুনতে গল্প মনে হলেও ইলিশের জেলা নামে পরিচিত লক্ষ্মীপুরে এখন এক কেজি ইলিশ মাছ কিনতে কৃষকদের গুনতে হচ্ছে দুই মণ ধানের দাম। জেলার হাটবাজার ঘুরে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।

কৃষকেরা বলেছেন, ধানের মাঠে কৃষকের ঘাম ঝরে, সেই ধান ওঠে হাটে। হাটে ধান বিক্রি করে যে টাকা মেলে, তা দিয়ে ইলিশ তো দূরের কথা, বাজারের অনেক কিছুই এখন নাগালের বাইরে। একদিকে কৃষকের গোলায় ওঠা ধান, অন্যদিকে বাজারের রুপালি ইলিশ—দুটিই এ অঞ্চলের মানুষের শ্রমের ফসল। কিন্তু দামের হিসাবে তাদের মধ্যে এখন যেন আকাশ-পাতাল ব্যবধান।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর ও সদর উপজেলার কয়েকটি হাটবাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে ধানের দাম নিয়ে কৃষকদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। জাত ও মানভেদে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়।

‘আগে ধান বিক্রি করে বাড়ির জন্য মাছ কিনতাম। এখন ধান বিক্রি করে বাজারে গিয়ে টাকা সঙ্গে করে শুধু ঘুরছি। কেনার সাহস পাই না। সবকিছুর দাম বেশি।’ ইলিশ কেনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দুই মণ ধান বিক্রি করে যদি এক কেজি ইলিশ কিনি, তাহলে সংসারের আর কী থাকবে? তাই ইলিশ এখন শুধু বাজারে দেখি।’
মো. কামাল হোসেন, কৃষক

লক্ষ্মীপুর ইলিশের জন্য পরিচিত জেলা। জেলায় প্রায় ৬০ হাজার জেলে মেঘনায় মাছ ধরায় নিয়োজিত। মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন হওয়ায় জেলার বাজারগুলোতে ইলিশের সরবরাহ থাকে। তবে মাছের আকার ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে দাম ওঠানামা করে। বর্তমানে বাজারে আকারভেদে ১ কেজি ইলিশের দাম প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। বড় ইলিশের দাম আরও বেশি। ফলে একজন কৃষক যদি ১ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করেন, তাহলে ১ কেজি ইলিশ কিনতে তাঁকে বিক্রি করতে হবে ২ মণ ধান।

রায়পুর বাজারে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষক মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘আগে ধান বিক্রি করে বাড়ির জন্য মাছ কিনতাম। এখন ধান বিক্রি করে বাজারে গিয়ে টাকা সঙ্গে করে শুধু ঘুরছি। কেনার সাহস পাই না। সবকিছুর দাম বেশি।’ ইলিশ কেনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দুই মণ ধান বিক্রি করে যদি এক কেজি ইলিশ কিনি, তাহলে সংসারের আর কী থাকবে? তাই ইলিশ এখন শুধু বাজারে দেখি।’

জেলার বাজারগুলোতে এক কেজি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়
ছবি: প্রথম আলো

লক্ষ্মীপুর শহরে দুই যুগ ধরে হাটে মাছ বিক্রি করেন মো. রুহুল আমিন। তিনি বলেন, এবার ইলিশের বাজার চড়া যাচ্ছে। নদীতে কম ইলিশ ধরা পড়ছে। এই কারণে অন্য বছরের চেয়ে এবার দাম বেশি।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ইলিশের দাম মূলত মাছের আকার, সরবরাহ ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে। বড় আকারের ইলিশের চাহিদা তুলনামূলক বেশি থাকায় দামও বেশি হয়। নদী ও সাগরে ইলিশের প্রাপ্যতা কমে গেলে বাজারে সরবরাহ কমে যায়, তখন দাম আরও বাড়ে। তবে ইলিশের প্রজনন ও সংরক্ষণ মৌসুমে মাছের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে বাজারে ইলিশের সরবরাহ বাড়লে দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে বলে আশা করা যায়।