রাজশাহী বিভাগে বিএনপি আসন বেশি পেলেও এগিয়েছে জামায়াত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি পেয়েছে ২৮টি, আর জামায়াত পেয়েছে ১১টি। বিএনপি আসন বেশি পেলেও ভোটে এগিয়েছে জামায়াত। কারণ, ২০০৮ সালের সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে এই বিভাগে জামায়াতের কোনো আসন ছিল না। এমনকি ২০০১ সালে চারদলীয় জোটে গিয়েও জামায়াত মাত্র দুটি আসন পেয়েছিল।
এই বিভাগের আটটি জেলা হলো রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, জয়পুরহাট, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ। দলীয় নেতা–কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে বিএনপির আসন কমেছে। আর জামায়াতের এগিয়ে যাওয়ার কারণ নারী ভোট।
জামায়াতের ১০ আসনেই নতুন মুখ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে জামায়াতের কেরামত আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে মিজানুর রহমান ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে নুরুল ইসলাম বুলবুল, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে রফিকুল ইসলাম খান, রাজশাহী-৪ আসনে আব্দুল বারী সরদার, জয়পুরহাট-১ আসনে ফজলুর রহমান সাঈদ, নওগাঁ-২ আসনে এনামুল হক, পাবনা-১ আসনে মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান, পাবনা-৩ আসনে মুহাম্মদ আলী আছগার এবং পাবনা-৪ আসনে মো. আবু তালেব মন্ডল এই প্রথম সংসদ সদস্য হলেন। শুধু রাজশাহী-১ আসনে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ১৯৮৬ সালে জিতেছিলেন।
দুটি জেলায় সব বিএনপি
এবার বগুড়ায় সাতটি ও নাটোরের চারটি আসনের সবগুলোই পেয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে বগুড়া-৬ আসনের প্রার্থী ছিলেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ দুটি জেলায় ২০০১ সালে ও ২০০৮ সালের নির্বাচনেও জামায়াতের কোনো আসন ছিল না।
যেসব জেলায় এক থেকে তিনটি আসন জামায়াতের
চাঁপাইনবাবগঞ্জে আসন তিনটি। ২০০৮ সালের আগে আসনগুলো বিএনপির দখলে ছিল। এমনকি ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি সারা দেশে যখন মাত্র ছয়টি আসন পেয়েছিল, তার দুটিই ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের। এবার তিনটি আসনই বিএনপির হাতছাড়া হয়ে গেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আসনগুলো জামায়াত পাওয়ার ব্যাপারে জাগো নারী বহ্নি শিখার উপদেষ্টা শফিকুল আলম বলেন, এবার শুধু নারীদের ভোটেই জামায়াত অনেক এগিয়ে গেছে। তারা ৫ আগস্টের পর থেকেই প্রার্থী ঠিক করে মাঠে নিবিড় গণসংযোগ চালিয়েছে। বিএনপি প্রার্থী দিয়েছে মাত্র তিন মাস আগে। ২০১৮ সালে সদর আসনে হারুন বিপুল ভোট জয়লাভ করেছিলেন। এবার দলগতভাবে কাজ করতে না পারায় হেরে গেছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সবগুলো আসনে হারার জন্য জেলা বিএনপির সদস্যসচিব রফিকুল ইসলাম সদর আসনের প্রার্থী হারুনুর রশীদকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালের পর তিনি এলাকায় ছিলেন না। ৫ আগস্ট দুপুরের পরে এসে হাজির হয়েছেন। দলের কোনো পর্যায়ের কমিটিকে নিয়ে বসেননি। কেউ যোগাযোগ করতে গেলে বলেছেন, তোমরা তোমাদের মতো কাজ করো। তিনি আওয়ামী লীগ-কৃষক লীগের নেতাদের নিয়ে মাঠে ছিলেন। এতে দলের সাধারণ ভোটাররা তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।’
রাজশাহীর পাঁচটি আসনের মধ্যে রাজশাহী-১ ও ৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থীর কাছে বিএনপির প্রার্থী হেরে গেছেন। অথচ ২০০১ সালের নির্বাচনে রাজশাহীর পাঁচটি আসনই ছিল বিএনপির। দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও রাজশাহী-৫ আসনে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম প্রায় ৮০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
রাজশাহী-১ আসন হারানোয় বিএনপির নেতা–কর্মীরা বেশি হতাশ। আসনটি বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ছিল। এবার তাঁর ভাই মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন ১ হাজার ৮৮৪ ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের নায়েবে আমিরের কাছে হেরেছেন। দলীয় নেতা–কর্মীরা বলছেন, এই আসনে প্রচারে প্রার্থীর জড়তা ছিল। দলের মনোনয়নবঞ্চিতদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল না। নির্বাচনের আগে দলীয় কোন্দলে দুটি খুনের মামলার আসামিদের পৃথক প্রচার ও জামায়াতের নারী ভোটারদের সক্রিয়তার কারণে বিএনপির প্রার্থী হেরে গেছেন।
রাজশাহী-৪ আসনটি ‘দুর্বল’ প্রার্থীর কারণেই হাতছাড়া হয়েছে বলে মনে করছেন দলের অনেক নেতা–কর্মী। তাঁরা বলছেন, তিনি যে ভোটে হারছেন, তা আগে থেকেই অনুমান করা যাচ্ছিল।
পাবনার পাঁচটি আসনের মধ্যে এবার তিনটিই পেয়েছেন জামায়াতের প্রার্থীরা। এই জেলায় ১৯৯১ সালে জামায়াত দুটি আসন পেয়েছিল। এই দুটি আসন হচ্ছে পাবনা-১ ও ৫। পাবনা-১ আসনটি ছিল জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর।
স্থানীয় নেতা–কর্মীদের মতে, এবার পাবনা-১ আসনে সীমানা জটিলতার কারণে বিএনপি প্রার্থী দিয়েছে দেরিতে। তা ছাড়া যাঁকে প্রার্থী করা হয়েছে, তিনি মতিউর রহমান নিজামীর ছেলের বিপরীতে আর্থিকভাবে খুবই দুর্বল ছিলেন। এবার এই আসনে মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান জয় পেয়েছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পাবনা জেলার সভাপতি আবদুল মতিন বলেন, পাবনা-১ আসনে জামায়াতের সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর বাড়ি। ওই আসনটা দলটি পেতেই পারে, এমন একটা ধারণা সবারই ছিল। কিন্তু অন্য আসনগুলো বিএনপির একাধিক প্রার্থীর কারণেই হারিয়েছে। একই কারণে কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুর রহমানও হেরেছেন। আর জামায়াতের ভোট সারা দেশেই বেড়েছে। তবে এটা সাময়িক না স্থায়ী, তা বোঝার জন্য আরেকটি নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
বিভাগের সবচেয়ে ছোট একটি জেলা হচ্ছে জয়পুরহাট। আসন মাত্র দুটি। এই দুটি আসন কখনোই জামায়াতের দখলে যায়নি। এবার জয়পুরহাট-১ আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হয়ে গেছে। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী যে ভোটে হেরেছেন, বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী তার চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন।
নওগাঁর পাঁচটি আসন। ১৯৯১ সালে নওগাঁ-৪ আসন জামায়াত পেয়েছিল। তারপর থেকে দলটির কোনো আসন ছিল না। এবার নওগাঁ-২ আসনটি জামায়াত পেয়েছে।
সিরাজগঞ্জের ছয়টি আসনের মধ্যে একটিতে জামায়াত আর বাকিগুলোতে বিএনপির প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন। সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা রফিকুল ইসলাম খান জয়লাভ করেছেন।
যা বলছে দলগুলো
রাজশাহী বিভাগে জামায়াতের আগের চেয়ে ভালো করার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজশাহী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ও ছাত্রশিবিরের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি আশরাফুল আলম ইমন বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের জুলুম-নির্যাতনের পরও জামায়াত মহল্লা ও ওয়ার্ডভিত্তিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছিল। অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষের পাশে থেকে জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। সর্বোপরি প্রার্থীরা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ অন্যায় কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকায় জনগণ জামায়াতকে সমর্থন জানিয়েছে।
আর আসনগুলো বিএনপির হাতছাড়া হওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত বলেন, ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকার জনগণ ভারতবিরোধী রাজনীতির দিকে ঝুঁকে থাকে। তাদের এখন তৃতীয় থেকে চতুর্থ প্রজন্ম চলছে। বিএনপি প্রথম থেকেই দেশের স্বার্থে তাদের সেন্টিমেন্ট ধারণ করেছে, কিন্তু জামায়াত এবার সেটা বেশি কাজে লাগিয়েছে। তারা ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে বয়সী ভোটারদের, বিশেষ করে নারীদের বেশি টেনেছে। আর বিএনপির সাংগঠনিক কিছু ব্যর্থতাও রয়েছে।