দীর্ঘ বিরতির পর ময়মনসিংহের ৮টি আসনে জয়ের দেখা পেল বিএনপি
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচন ছাড়া স্বাধীনতার পর ময়মনসিংহ-১০ ও ১১ আসনে মাত্র একবার করে জয় পেয়েছিলেন বিএনপিদলীয় প্রার্থীরা। এ আসনগুলোয় বেশির ভাগ সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই সংসদ সদস্য হয়ে আসছিলেন। এবার আওয়ামী লীগবিহীন ভোটে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসন পুনরুদ্ধার করেছেন ধানের শীষের প্রার্থীরা।
এ ছাড়া ১৯৯১ সালের পর ময়মনসিংহ-৭ আসন, ১৯৯৬ সালের পর ময়মনসিংহ-৩ আসন এবং ২০০১ সালের পর ময়মনসিংহ- ৪, ৫, ৮ ও ৯ আসনে ধানের শীষের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। ময়মনসিংহ-১১ আসনে ২০০৮ ও ২০১৮ সালে দুবার পরাজিত হয়ে এবার ধানের শীষ নিয়ে জয়ী হয়েছেন ফখর উদ্দিন আহমেদ। ময়মনসিংহ-১০ আসনে এবারই প্রথম নির্বাচনে অংশ নিয়ে বাজিমাত করেছেন মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান।
ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছিলেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হন দক্ষিণ জেলা বিএনপির আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান। বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামানকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার পর মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্য নেতাদের একটি অংশ এলাকায় সংঘাতময় পরিস্থিতিও তৈরি করেছিল। কিন্তু ৭৫ হাজার ৫৮৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন ধানের শীষের প্রার্থী। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান পান ৬৭ হাজার ১৩ ভোট। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন বাদ দিলে এ আসনে সর্বশেষ বিএনপি বিজয়ী হয়েছিল ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে। ৪৭ বছর পর এ আসনে নির্বাচিত হয়ে কৃষিনির্ভর এলাকাকে শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান।
ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে জয়ী হয়েছিলেন আমানউল্যাহ চৌধুরী। দীর্ঘ ৩৫ বছরের খরা কাটিয়ে এ আসন বিএনপিকে উপহার দিয়েছেন ফখর উদ্দিন আহমেদ। তিনি ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হলেও এবার ১ লাখ ১১ হাজার ২৩০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম ছিলেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম। তিনি ৬৬ হাজার ১৬ ভোট পান।
ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনে ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে ৫১১ ভোটে হারিয়ে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন আবদুল খালেক। অবশ্য ১৯৭৯ সালেও এ আসনে বিএনপি থেকে এ মনসুর আহমেদ জয়ী হয়েছিলেন। ৩৫ বছর পর এবার আসনটিতে জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মো. মাহবুবুর রহমান। তিনি পেশায় চিকিৎসক। তিনি ৯৯ হাজার ৪৯ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আছাদুজ্জামান দাঁড়িপাল্লা নিয়ে ৮৪ হাজার ৮৫১ ভোট পান।
ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আসনে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে ৫ হাজার ৪২০ ভোটে হারিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন নাজমুল হুদা। ২০০১ সাল থেকে পরবর্তী সময়ে এ আসন আর বিএনপি নিতে পারেনি। ১৯৭৯ সালেও একবার বিজয়ী হয়েছিলেন বিএনপি প্রার্থী নাজমুল হুদা। দীর্ঘ ৩০ বছর পর এবার এ আসনে ৭৫ হাজার ৩২০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন এম ইকবাল হোসেইন। তিনি এর আগে ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছিলেন।
ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনে ২০০১ সালের পর এবার সংসদ সদস্য হয়েছেন বিভাগীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবু ওয়াহাব আকন্দ। তিনি ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৬৮ ভোট পান। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কামরুল আহসান ১ লাখ ৭১ হাজার ৮৮০ ভোট পান। এর আগে ১৯৯১ ও ১৯৭৯ সালেও বিএনপির প্রার্থীরা আসনটিতে সংসদ সদস্য ছিলেন।
ময়মনসিংহ-৫ (মুক্তাগাছা) আসনেও সর্বশেষ ২০০১ সালে জয় পেয়েছিল বিএনপি। সেবার বিএনপির প্রার্থী ছিলেন এ কে এম মোশারফ হোসেন। এবার এ আসনে জয় পেয়েছেন মোহাম্মদ জাকির হোসেন। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম মোশারফ হোসেনের ছোট ভাই। জাকির হোসেন ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৯৬ ভোট পান। তাঁর নিকটতম ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি মতিউর রহমান আকন্দ। তিনি পান ১ লাখ ২ হাজার ২২৬ ভোট।
ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনে ১৯৭৯ ও ২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থীরা সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। ২৫ বছর পর এ আসনে জেলায় রেকর্ড ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন লুৎফুল্লাহেল মাজেদ। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৬৮৫ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির মো. আওরঙ্গজেব পান ৪৬ হাজার ৫১৫ ভোট। বিএনপির প্রার্থী ৬২ হাজার ১৭০ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন।
এ ছাড়া ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল) আসনে ১৯৭৯, ১৯৯১ ও ২০০১ সালের পর এবার বিএনপি থেকে জয় পেয়েছেন ইয়াসের খান চৌধুরী। তাঁর বাবা আনোয়ারুল হোসেন খান চৌধুরী ১৯৯১ সালে এবং তাঁর চাচা খুররম খান চৌধুরী ১৯৭৯ ও ২০০১ সালে এ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। পূর্বসূরিদের আসনে ২৫ বছর পর জয়ী হয়েছেন ইয়াসের খান চৌধুরী। তিনি ৮৫ হাজার ৭৬১ ভোট পান। তাঁর নিকটতম ছিলেন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম। ফুলকপি প্রতীকে তিনি ৭১ হাজার ১৬৮ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। এ আসনে ইয়াসের খানের চাচা খুররম খান চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা খান স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় শুরু থেকে ছিল আলোচনা। হাসিনা খান হাঁস প্রতীক নিয়ে পান ৩০ হাজার ৫০৯ ভোট।