ফুটবল খেলা দেখতে গ্যালারি ছাপিয়ে মাঠে, এমনকি গাছের ডালেও দর্শক

চাঁপাইনবাবগঞ্জে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলায় বল দখলের লড়াইয়ের একটি দৃশ্য। রোববার বিকেলে জেলা স্টেডিয়ামেছবি: প্রথম আলো

চাঁপাইনবাবগঞ্জে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলায় মানুষের ফুটবল উন্মাদনা ছিল দেখার মতো। ফুটবলপ্রিয় মানুষদের সেই বহিঃপ্রকাশই দেখা গেল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা স্টেডিয়ামে।

ম্যাচ ঘিরে স্টেডিয়ামের গ্যালারি ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। বাউন্ডারির গ্রিলের ওপর, বাউন্ডারির বাইরে গাছের ডালে ডালে ফুটবলপ্রিয় দর্শকদের উপস্থিতি প্রমাণ করে ফুটবলের প্রতি মানুষের দারুণ ভালোবাসা।

খেলার প্রথমার্ধেই সেই বাউন্ডারির গ্রিল টপকে মাঠের মধ্যে দৌড়ে এসে সাইড লাইনের পাশেও বসে পড়তে দেখা যায় বহু দর্শককে। পুলিশ ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মীরা তাঁদের ঠেকাতে ব্যর্থ হন। হাজার হাজার দর্শকে মুখর ছিল স্টেডিয়ামের পরিবেশ। টান টান উত্তেজনা ও আনন্দ–উল্লাসে ফেটে পড়ছিলেন দর্শকেরা। দর্শকদের সামাল দিতে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের হিমশিম খেতে হয়।  

চাঁপাইনবাবগঞ্জে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে গোমস্তাপুর উপজেলা দল। রোববার বিকেলে জেলা স্টেডিয়ামে
ছবি: প্রথম আলো

রোববার বিকেলে জেলা স্টেডিয়ামে (নতুন স্টেডিয়াম) জেলা প্রশাসন ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার যৌথ আয়োজনে এ খেলা হয়। খেলায় পৃষ্ঠপোষকতা করে এরফান গ্রুপ।

ফাইনাল খেলায় অংশ নেয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা ও গোমস্তাপুর উপজেলা দল। এতে চ্যাম্পিয়ন হয় গোমস্তাপুর উপজেলা দল। নির্ধারিত সময়ে কোনো দলই গোল দিতে পারেনি। খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। টাইব্রেকারে গোমস্তাপুর উপজেলা দল ৪-৩ গোলে সদর উপজেলা দলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। গোমস্তাপুর দলের হয়ে গোল করেন আসমাউল, আবু বক্কর, মসিউর রহমান ও সাদ্দাম আলী। সদর উপজেলা দলের হয়ে গোল করেন উমর আলী, আহাদ আলী ও রহমতুল্লাহ।

ফাইনাল খেলা দেখতে আসা নানা বয়সী দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়। রোববার বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা স্টেডিয়ামে
ছবি: প্রথম আলো

খেলা দেখতে আসা ৬৮ বছর বয়সী চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার টিকরামপুর মহল্লার আশরাফুল হক বলেন, ‘ফুটবল হামাদের মনে ঢুইক্যা আছে। হামার প্রিয় খেলা ফুটবল। আইজ ফাইনাল খ্যালা। মন মানেনি হামার। তাই তো ছুইট্যা আইস্যাছি খ্যালা দেখতে। ছোরাগালাদের (তরুণ-যুবকদের) মধ্যে হুড়িয়া পারিনি, তাই মাঠের বাইরে গ্রিলের ধারে খেলা দেখছি। বয়সের লাইগ্যা গ্রিলের ওপরও উঠতে পারছি না। কিন্তু খ্যালা দেখ্যা হামি খুশি।’

গোমস্তাপুর উপজেলার দোসিমনি কাঁঠাল গ্রাম থেকে ১০ বন্ধু মিলে মাইক্রোবাস ভাড়া করে খেলা দেখতে এসেছিলেন ব্যবসায়ী শাহজাহান আলী। প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘নিজ উপজেলার সঙ্গে খেলা। নিজেকে কি আর ধরে রাখতে পারি? ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা আছে বলেই তো আমরা বন্ধুরা মিলে চলে এসেছি খেলা উপভোগ করতে। একটি দিন না হয় ব্যবসা করলাম না। কিন্তু ফুটবল খেলা ছাড়া যাবে না। খেলায় যে দলই জিতুক না কেন, উপভোগ করাটাই বড় কথা। তবে আমাদের উপজেলা চ্যাম্পিয়ন হলে খুশি হব বেশি।’

ক্যাপশন ৪: গ্যালারিতে জায়গা না পেয়ে অনেকে গ্রিল ও গাছের ডালে বসে খেলা দেখেন। রোববার বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা স্টেডিয়ামে
ছবি: প্রথম আলো

সদর উপজেলার রেহাইচর মহল্লার বাসিন্দা ওষুধ ও বিকাশ দোকানমালিক মো. ইসমাইলও এসেছেন খেলা দেখতে। মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করতে না পেরে বাউন্ডারির দেয়াল ও গ্রিল টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন। তিনি বলেন, বাড়ির পাশে স্টেডিয়ামে খেলা হচ্ছে, তা–ও আবার ফুটবল খেলা। কিসের ব্যবসা! আজ খেলা দেখতে হবে, এটাই বড় কথা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ ফুটবলপ্রিয়। এককথায় পাগলপনা রয়েছে ফুটবলের প্রতি। তার প্রমাণ মাঠজুড়ে দর্শক দেখেই বোঝা যায়। খেলায় যে–ই জিতুক, সবার জন্যই ভালোবাসা।

খেলায় ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হন সদর উপজেলা দলের মো. নাসির। পাঁচটি করে গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার পান যৌথভাবে সদর উপজেলার ওমর আলী ও গোমস্তাপুরের লয়। ম্যান অব দ্য ফাইনাল নির্বাচিত হয়েছেন গোমস্তাপুরের আবু বক্কর। সেরা গোলকিপার নির্বাচিত হয়েছেন শিবগঞ্জ উপজেলার আরিয়ান। সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে নেন নাচোল উপজেলার আলবেনুস কিসকু।

খেলা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা। জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলী। বক্তব্য দেন পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস, স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক উজ্জ্বল কুমার ঘোষ, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম জাকারিয়া, এরফান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব আলম প্রমুখ।