ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেলমেট ও প্রতিরক্ষা জ্যাকেট পরে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১৫
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আধিপত্য বিস্তারের জেরে একটি চায়ের দোকান উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে বল্লম, এককাইট্টা, চায়নিজ কুড়াল নিয়ে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে চার ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষ হয়েছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষে নাটাই-অষ্টগ্রাম আঞ্চলিক সড়কে তিন ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। আজ রোববার সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত সদর উপজেলার নাটাই উত্তর ইউনিয়নের থলিয়ারা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে অংশ নেওয়া দুই পক্ষের লোকজনের মাথায় ছিল হেলমেট, বুকে ছিল প্রতিরক্ষা জ্যাকেট।
সদর উপজেলার থলিয়ারা গ্রামের মিন্দান আলী বা ছোট গোষ্ঠীর সঙ্গে একই গ্রামের ভূঁইয়া বা মধ্যি বাড়ি গোষ্ঠীর লোকজনের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। মিন্দান আলী বাড়ির নেতৃত্বে রয়েছেন মো. জোবায়ের ও ভূঁইয়া বাড়ি বা মধ্যি বাড়ির নেতৃত্বে রয়েছেন মো. জয়নাল আবেদীন।
স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নাটাই উত্তর ইউনিয়নের থলিয়ারা গ্রামের ভূঁইয়া বাড়ির পুকুরপাড়ে শিরু মিয়া নামের এক ব্যক্তির একটি চায়ের দোকান রয়েছে। নিয়মিত টেলিভিশন চলায় সারা দিনই দোকান ও দোকানের পাশের পুকুরের ঘাটলায় মানুষের জটলা জমে। দোকানের পাশ দিয়ে চলাচলকারী নারী ও মেয়েদের উদ্দেশ্য করে জটলা থেকে অপ্রীতিকর মন্তব্য করা হয়। পাশাপাশি গ্রামের মিন্দান আলী বা ছোট গোষ্ঠীর মো. জোবায়েরের পক্ষের লোকজনের সঙ্গে একই গ্রামের ভূঁইয়া বাড়ি বা মধ্যি বাড়ির জয়নাল আবেদীনের পক্ষের লোকজনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। পূর্ববিরোধের সঙ্গে চায়ের দোকান উচ্ছেদের প্রসঙ্গ নতুন করে যুক্ত হয়। মিন্দান আলী বা ছোট গোষ্ঠীর লোকজন গ্রামের ওই চায়ের দোকান উচ্ছেদের পক্ষে।
সম্প্রতি গ্রামের একটি সালিসে দোকানটি উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু দোকান উচ্ছেদের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নেন ভূঁইয়া বাড়ি বা মধ্যি বাড়ি মো. জয়নাল আবেদীনের পক্ষের লোকজন। দোকান উচ্ছেদের বিরোধকে কেন্দ্র করে আজ সকাল ৯টার দিকে গ্রামে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। কথা–কাটাকাটির এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের লোকজন দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নেন ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের দোকানপাট ও বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে গ্রামের ভেতর থেকে নাটাই-অষ্টগ্রাম আঞ্চলিক সড়কসহ পাশের ফসলি জমিতে ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষ চলে বেলা একটা পর্যন্ত। এতে নাটাই-অষ্টগ্রাম আঞ্চলিক সড়কে তিন ঘণ্টা সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ ছিল। খবর পেয়ে বেলা ১১টার দিকে সদর থানার পুলিশের একাধিক দল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে বেলা একটার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের আনেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষ চলাকালে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে নারীসহ অন্তত ১৫ জন আহত হন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজনকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে পিঠে এককাইট্টা বিদ্ধ একজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, নারী-পুরুষসহ উভয় পক্ষের লোকজনের মাথায় হেলমেট, বুকে প্রতিরক্ষা জ্যাকেট পড়া। উভয় পক্ষের হাতে ছিল এককাইট্টা, বল্লম, লাঠি, ছুরি, রামদা, চায়নিজ কুড়াল। সংঘর্ষ চলাকালে উভয় পক্ষের লোকজন রাস্তা থেকে টিনের বেড়া সামনে রেখে একে অপরকে উদ্দেশ্য করে ইটপাটকেল ও পেট্রল বোমা ছোড়েন। চলে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। নাটাই-অষ্টগ্রাম আঞ্চলিক সড়কে উভয় পক্ষ অবস্থান নেওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। এতে অষ্টগ্রাম উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ পথচারীরা ভোগান্তি পড়ে।
নাটাই উত্তর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইয়াকুব আলী ভূঁইয়া বলেন, গ্রামে জারু মিয়ার চায়ের দোকান উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষে ঘটনা ঘটে। কয়েক দিন আগে এক সালিসে দোকান উচ্ছেদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলেও একটি পক্ষ তা মানেনি। একাধিকবার চেষ্টা করেও মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া মো. জোবায়ের ও জয়নাল আবেদীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, গ্রামের একটি চায়ের দোকান উচ্ছেদের মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছোট গোষ্ঠী ও বড় গোষ্ঠীর লোকজন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশের একাধিক দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে বেলা একটায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। সংঘর্ষে জড়িতে সন্দেহে চারজনকে আটক করা হয়েছে। উভয় পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পরবর্তী সংঘর্ষ এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।