পাঁচ দশক ধরে ঘুড়ি বানাচ্ছেন রংপুরের ‘গুড্ডি দাদু’, রাঙাচ্ছেন শিশু–কিশোরদের শৈশব
রংপুর নগরের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র সেন্ট্রাল রোডের আশপাশে প্রায়ই দেখা যায় এক বৃদ্ধকে, যিনি বার্ধক্যকে জয় করে এখনো সাইকেল চালিয়ে বেড়ান চারপাশ। তবে এটি তাঁর মূল পরিচয় নয়; বরং তিনি এলাকায় পরিচিত ‘গুড্ডি দাদু’ হিসেবে। পাঁচ দশক ধরে নিজ হাতে ঘুড়ি বানিয়ে তিনি রংপুরের শিশুদের মুখে হাসি ফুটিয়ে চলছেন।
শিশুদের আনন্দময় শৈশব দেখানো এই স্বপ্নবাজ মানুষটি হলেন আবদুর রাজ্জাক। তাঁর বাড়ি রংপুর নগরের বেগম রোকেয়া কলেজের পেছনে শাহীপাড়ায়। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুসারে, তাঁর জন্ম ১৯৩২ সালে। অর্থাৎ তিনি এখন চুরানব্বই–ঊর্ধ্ব। এ বয়সেও দুই হাতে বানিয়ে চলছেন শৈশবের সেই রঙিন ঘুড়ি।
এটা শখের বশে করি আরকি। এখন তো আর অত টাকা লাগে না। ছেলেরা আছে, তারাই দেখাশোনা করে। আমি শুধু সময় কাটানোর জন্য আর স্মৃতি ধরে রাখার জন্য এটা করি।আবদুর রাজ্জাক, ঘুড়ির কারিগর
আবদুর রাজ্জাকের আদি নিবাস ছিল ভারতের বিহার রাজ্যের মোজাফফরপুর জেলার মুরগিয়ার চরে। ১৯৪৬ সালে শৈশবে বাবার সঙ্গে রংপুরে চলে আসেন। তাঁর বাবা উজির মিয়া এখানেই কাজ করতেন। কোনো সময় রিকশা চালাতেন, আবার লেপ-তোশকও বানাতেন। দেশভাগের পর আর বিহার ফেরা হয়নি তাঁদের। পরিবারসহ রংপুরেই থিতু হন তাঁরা।
গতকাল সোমবার বিকেলে আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে তাঁর বাড়িতে কথা হয় প্রথম আলোর। আবদুর রাজ্জাক জানান, তখন তাঁর বয়স ২৮ থেকে ৩০। রংপুর নগরের ফায়ার সার্ভিস মোড়ে বিস্কুটের বেকারি ছিল তাঁর। কারখানা ছিল বাড়িতে, তিনি ছিলেন বিস্কুট বানানোর কারিগর। ওই সময় তাঁর দোকানে স্কুলপড়ুয়া ছেলেরা বিস্কুট খেতে আসত। তাদের সঙ্গে ঘুড়ি বানানোর রঙিন কাগজ থাকত।
ওই সময়ের স্মৃতিচারণা করে আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘একটা কাগজ দিয়ে গুড্ডি বানাইলাম, ওটা উড়ল ভালো। তার পর থেকে ওই দোকানে বসেই গুড্ডি বানানো শুরু করলাম। আমার ঘুড়িটা ওড়ে ভালো। সুতা টানে না, মানে একদিকে হেলে যায় না। এ জন্য সবাই আসে।’
রংপুরের গুপ্তপাড়ার বাসিন্দা চন্দন কুমার মণ্ডলের (৫০) শৈশব কেটেছে আবদুর রাজ্জাকের বানানো ঘুড়ি উড়িয়ে। তিনি বলেন, ‘আমার মনে আছে, আমি আট আনা দিয়ে গুড্ডি কিনছি ওনার (আবদুর রাজ্জাক) কাছ থেকে। তারপর ১২ আনা, এক টাকা, এভাবে অনেক দিন কিনেছি। তখন কালেক্টরেট মাঠে ঘুড়ি উড়াইতাম, সবাই আট থেকে দশটা করে নিয়ে যেত। ওই সময়গুলো আমাদের ভালো কাটত।’
এই সংসার চলেছে গুড্ডি বেচা টাকায়। তারপর আবার লেপ–তোশকও বানাইত। মানে এটার ওপরেই তিনটা মেয়ে বিয়ে দিছে, তারপর চারটা বোন, তারপর ওনার নিজের দুইটা ছেলে বিয়ে দিল—এগুলার ওপরেই তো।জোবেদা বেগম, আবদুর রাজ্জাকের স্ত্রী
সংসারের হাল ধরেছে ঘুড়ি
আবদুর রাজ্জাকের ঘুড্ডি নিয়ে নস্টালজিয়া উসকে দিলেন তাঁর প্রতিবেশী ও ফায়ার সার্ভিস মোড়ের কাঠ ব্যবসায়ী মাহমুদুল হাসান (৫৪)। তিনি বলেন, তাঁদের শৈশবে রংপুরে শিমুল, শাপলা ও মিঠু ব্র্যান্ডের ঘুড়ির জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। এর মধ্যে শাপলা ব্র্যান্ডের ঘুড়ি ছিল আবদুর রাজ্জাকের। তাঁর হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় তৈরি চশমাদার, পটিদার, সাপ ঘুড়ি কিংবা বিশাল আকৃতির ঢাউস ঘুড়ির কদর ছিল আকাশচুম্বী। চৈত্রসংক্রান্তি, পয়লা বৈশাখ অথবা অন্য কোনো মেলা-পার্বণে আবদুর রাজ্জাকের রঙিন ঘুড়িতে মেতে থাকত রংপুরের আকাশ। অনেক সময় বিনা মূল্যেও ঘুড়ি দিতেন তিনি।
আবদুর রাজ্জাক একসময় বিস্কুটের দোকান বাদ দিয়ে ঘুড়ি বানানোকে প্রধান পেশা হিসেবে বেঁচে নেন। তিনি জানান, ফাল্গুন থেকে জ্যৈষ্ঠ—এই চার মাস বাতাস ভালো থাকে। তখন তিনি বাড়িতে হাজার হাজার ঘুড়ি তৈরি করতেন। দিন–রাত শুধু এ কাজেই ডুবে থাকতেন। দূরদূরান্ত থেকে পাইকারেরা এসে ঘুড়ি কিনে নিয়ে যেতেন। তাঁর ঘুড়ি ওড়ার নিশ্চয়তা থাকত বলেই মানুষ দূরদূরান্ত থেকে আসত।
আবদুর রাজ্জাকের স্ত্রী জোবেদা বেগমও অশীতিপর। ওই সব দিনের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই সংসার চলেছে গুড্ডি বেচা টাকায়। তারপর আবার লেপ–তোশকও বানাইত। মানে এটার ওপরেই তিনটা মেয়ে বিয়ে দিছে, তারপর চারটা বোন, তারপর ওনার নিজের দুইটা ছেলে বিয়ে দিল—এগুলার ওপরেই তো।’
আবদুর রাজ্জাক এখন ‘গুড্ডি দাদু’
বয়স ৯০ পেরোনো আবদুর রাজ্জাক এখনো বাড়িতে ঘুড়ি বানান। তবে এখন আর পেশার জন্য নয়, বরং মনের আনন্দে। জানান, পাইকারদের চাহিদামতো বানিয়ে দিতে পারেন। এমনিতেই সব সময় পাঁচ–সাতটি ঘুড়ি বানিয়ে রাখেন। ছোট ঘুড়ি ১০ থেকে ১৫ টাকায়, মাঝারি ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি করেন।
আবদুর রাজ্জাকের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, তিনি বিছানায় বসে টেবিলের ওপর বাঁশের সরঞ্জাম ও রঙিন কাগজ দিয়ে ঘুড়ি বানাচ্ছেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘এটা শখের বশে করি আরকি। এখন তো আর অত টাকা লাগে না। ছেলেরা আছে, তারাই দেখাশোনা করে। আমি শুধু সময় কাটানোর জন্য আর স্মৃতি ধরে রাখার জন্য এটা করি। আল্লাহর রহমতে চোখে এখনো ভালোই দেখি। চশমা লাগে না। কাঠি চাঁছতে বা ঘুড়ি বাঁধতে কোনো সমস্যা হয় না।’
আবদুর রাজ্জাকের ছেলের স্ত্রী নার্গিস বেগম বলেন, বয়সের ভারে ঘুড়ি বানানোর পরিমাণ কমলেও শিশুদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা বিন্দুমাত্র কমেনি। এখনো কোনো শিশু দাদু দাদু ডেকে ঘুড়ির আবদার নিয়ে এলে তাঁর চোখে–মুখে হাসি ফুটে ওঠে। নিজের অজান্তে তিনি শিশুদের কাছে ‘গুড্ডি দাদু’ হয়ে উঠেছেন। তিনি যে নেশা ধরে রেখেছেন ভালোবেসে, এটা ব্যক্তিক্রম।
আবদুর রাজ্জাকের বাড়িতে পাওয়া গেল রংপুর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী ওমর ফারুককে। সে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে ঘুড়ি নিতে এসেছে। ওমর ফারুক বলে, ‘গুড্ডি দাদু ভালো গুড্ডি বানায়। ওড়ানো যায় হালকা বাতাসে।’
ঘুড়ি আবহমানকাল থেকে এ দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে বলে জানালেন বাংলা একাডেমির সহপরিচালক ও বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবিদ করিম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমরা শৈশবে দেখেছি, ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা ছিল। এখন বহুতল ভবন ও উন্মুক্ত মাঠ না থাকার কারণে শহরে ঘুড়ি ওড়ানো প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। তবু যখন বিভিন্ন উৎসব-পার্বণ হয়, এগুলোয় ছেলেমেয়েরা এক দিনের জন্য হলেও বাঙালির এই ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির কাছে ফিরে আসে। এই ফিরে আসাটা এখনো টিকিয়ে রেখেছেন আবদুর রাজ্জাক। এবারের পয়লা বৈশাখের গ্রামগঞ্জের মেলায় তাঁর তৈরি ঘুড়ি পাওয়া যাবে। তিনি ঘুড়ি ওড়ানোর নস্টালজিয়াকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।’