বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্য বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, দেশে ফিরেছেন প্রায় এক যুগ পর। দলীয় প্রার্থী হিসেবে সুনামগঞ্জ-৩ আসনে (জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ) নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। নির্বাচনী মাঠে এখন সরব আলোচনা তাঁর ‘দ্বৈত নাগরিকত্ব’ নিয়ে। এই আসনের দুই প্রার্থীর অভিযোগ, তিনি (কয়ছর) যুক্তরাজ্যের নাগরিক। দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি তিনি গোপন করেছেন। আর কয়ছর আহমেদ বলেছেন, তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিক নন।
৩ জানুয়ারি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়ার কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে প্রার্থীদের জমা দেওয়া মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই কার্যক্রম হয়। সেখানে কয়ছর আহমেদের প্রসঙ্গ এলে তাঁর দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আনোয়ার হোসেন ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ইয়াসীন খান। বিষয়টি নিয়ে তখন তিন প্রার্থী ও রিটার্নিং কর্মকর্তার মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ কথা-কাটাকাটি হয়।
কয়ছর আহমেদ মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামায় ‘আপনি দ্বৈত নাগরিকত্বধারী কি না’ কলামে ‘না’ উল্লেখ করেছেন। তাঁর মনোনয়নপত্র যাচাইকালে রিটার্নিং কর্মকর্তা অন্য প্রার্থী ও উপস্থিত অন্য ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে কয়ছর আহমেদের মনোনয়নপত্রের বিষয়ে কারও কোনো আপত্তি আছে কি না, জানতে চান। তখন মো. আনোয়ার হোসেন ও ইয়াসীন খান আপত্তি জানান। তাঁরা বলেন, কয়ছর আহমেদের যুক্তরাজ্যে নাগরিকত্ব আছে এবং এ বিষয়ে তাঁদের কাছে প্রমাণও আছে। তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেননি। তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিলের দাবি জানান এই দুই প্রার্থী। তখন কয়ছর আহমেদ বলেন, তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব নেননি। যেহেতু নাগরিকত্ব নেননি, তাই নাগরিকত্ব পরিত্যাগের বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক। এরপর রিটার্নিং কর্মকর্তা হলফনামার তথ্য ধরে কয়ছর আহমেদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনে আপিল করার সুযোগ আছে বলে জানান।
স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আনোয়ার হোসেনও একসময় যুক্তরাজ্যে ছিলেন। তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘৯ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনে এ বিষয়ে আপিল করার সুযোগ আছে। এ বিষয়ে কী করা যায়, আমি চিন্তাভাবনা করছি।’
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ইয়াসীন খান প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘আমাদের আপত্তি জানানোর বিষয়টি আমলে নেননি রিটার্নিং কর্মকর্তা। এ বিষয়ে আমাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ আছে। আমরা নির্বাচন কমিশনে আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
এ বিষয়ে জানতে সোমবার দুপুরে কয়ছর আহমেদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের দিন তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এ ব্যাপারে আমার কোনো বক্তব্য নেই। কোন প্রার্থী কী বলল, কী চাইল, সেটা কর্তৃপক্ষ যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেবে।’
মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদের বাড়ি জগন্নাথপুর উপজেলার ছিলিমপুর এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দা ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তিনি ছাত্রজীবন থেকে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে থাকার সময়ে বিএনপির ডাকা হরতালের সময় জগন্নাথপুরে হাফিজুর রহমান নামের এক যুবদল নেতা মারা যান। এ নিয়ে দুই দলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি মামলা হয়। ওই বছর দেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান কয়ছর আহমেদ। তিনি যুক্তরাজ্য বিএনপির তিনবারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। কয়ছর এরপর ২০০৮ সালে এবং ২০১২ সালে দেশে এসে ঘুরে যান। ২০২৪ সালে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ওই বছরের ২০ অক্টোবর শতাধিক নেতা-কর্মী নিয়ে তিনি আবার দেশে আসেন এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য এলাকায় সভা-সমাবেশ করতে থাকেন।
দেশ-বিদেশে যত সম্পদ
কয়ছর আহমেদের হলফনামায় উল্লেখ গেছে, তাঁর পেশা ব্যবসা, বয়স ৫১ বছর। তিনি স্বশিক্ষিত। তাঁর বার্ষিক আয় ২৬ লাখ ৭০০ টাকা। এর মধ্যে দেশে কৃষি ও ব্যবসা থেকে ১১ লাখ ৭০০ টাকা এবং বিদেশে ব্যবসা থেকে ১৫ লাখ টাকা। দেশ-বিদেশে তাঁর অস্থাবর সম্পদ আছে ৪ কোটি ৩৩ লাখ ৭৯ হাজার ৪৪১ টাকার (অর্জনকালীন)। বর্তমানে এই সম্পদের মূল্য উল্লেখ করেছেন ৪ কোটি ১৭ লাখ ৭৪৪ টাকা। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে আছে নগদ ৩০ লাখ টাকা, যুক্তরাজ্যের মুদ্রা ২০ হাজার পাউন্ড, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা ১ কোটি ৪০ হাজার ৩০৩ টাকা। দুটি প্রতিষ্ঠানে শেয়ার ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার, দেশে একটি গাড়ি, যেটির অর্জনকালীন দাম ৭৫ লাখ টাকা, বিদেশে থাকা দুটি গাড়ির দাম ৫১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৪১ টাকা, সোনা ১০ ভরি, আসবাব সাড়ে ৬ লাখ টাকার।
কয়ছর আহমেদের দেশ-বিদেশে থাকা স্থাবর সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য ৬ কোটি ৩৯ লাখ ২৪ হাজার ৩৪৩ টাকা। এই সম্পদের বর্তমান মূল্য ২০ কোটি ৯০ লাখ ২৪ হাজার ৩৪৩ টাকা। সম্পদের মধ্যে দেশে কৃষিজমি আছে ১ দশমিক ৪৫ একর, যার দাম ২ লাখ ২১ হাজার ৪২০ টাকা, অকৃষি শূন্য দশমিক ৩৬৫ একরের দাম পাঁচ লাখ ৯২ হাজার টাকা, বাড়ি ৮ লাখ টাকা। বিদেশে একটি বাড়ি ও একটি দোকান আছে তাঁর। এগুলোর অর্জনকালীন দাম দেখানো হয়েছে ৬ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ৯২৩ টাকা। কয়ছর আহমেদ এবারের নির্বাচনের নিজের ব্যবসার আয় থেকে ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় করবেন বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা আইনসহ পাঁচটি মামলার কথা উল্লেখ আছে হলফনামায়। এর মধ্যে একটিতে অব্যাহতি এবং অন্যগুলোতে তিনি খালাস পেয়েছেন।