ভোলা-১ (সদর) আসনে সব দলের প্রার্থীরা ভোলাবাসীর দীর্ঘদিনের ৬ দফা দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিচ্ছেন। নদীভাঙন প্রতিরোধ, ভাঙনকবলিত মানুষের পুনর্বাসন, শিকস্তি-পয়স্তি সমস্যার স্থায়ী সমাধান, উন্নত চিকিৎসা, শিল্পায়ন ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি শোনা যাচ্ছে প্রার্থীদের গণসংযোগে। তবে স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও এসব দাবির বাস্তবায়ন না হওয়ায় ভোটারদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—এই আশ্বাসগুলোর বাস্তবায়নে শেষ পর্যন্ত কাকে বিশ্বাস করবেন তাঁরা?
ভোলা বরাবরই নদীভাঙনকবলিত জেলা। মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও ইলিশা নদীর ভাঙনে দিন দিন ছোট হয়ে আসছে জেলার আয়তন। নদীভাঙন প্রতিরোধে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও বন্ধ হয়নি ভাঙন, হয়নি টেকসই পুনর্বাসন; বরং ভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়ছে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা।
প্রাকৃতিক গ্যাস, চাল, ডাল, তেল, ফসল, মাছ, নারকেল, সুপারিতে উদ্বৃত্ত জেলা হয়েও ভোলা বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও মানবেতর জীবনের প্রতীক হয়ে উঠছে। জমি ও ঘর হারিয়ে হাজারো পরিবার ছিন্নমূল হচ্ছে। পুনর্বাসনের নামে অনেককে দুর্গম চরাঞ্চলে পাঠানো হলেও সেখানে নেই মৌলিক অধিকার, নেই স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগসুবিধা।
রাজাপুরে গিয়ে দেখা বাস্তবতা
ভোলা সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, মেঘনা ও ইলিশা নদীর তীরবর্তী বাঁধের বাইরে থাকা চারটি ওয়ার্ড মারাত্মক ভাঙনকবলিত। গত ৩০ বছরে ইউনিয়নের ১৬টি মৌজার প্রায় ৮ হাজার একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে দক্ষিণ রাজাপুর, চর মোহাম্মদ আলী ও কন্দর্পপুর মৌজার প্রায় ৪ হাজার পরিবার বর্ষা মৌসুমে জোয়ার ও ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে নিয়মিত ভুগছে।
দক্ষিণ রাজাপুর গ্রামের ভাঙনকবলিত বিধবা জামেলা খাতুন (৬১) বলেন, ‘আমি সাতবার ভাঙনের শিকার হয়েছি। শেষ পর্যন্ত ঢাকায় চলে গিয়েছিলাম। পরে স্বামী হযরত আলী কষ্ট করে ৫ গন্ডা জমি কিনেছিল। সেটার অর্ধেকও নদীতে চলে গেছে। বর্ষায় ঘরে পানি ওঠে, পলিথিন আর জাল দিয়ে ভিটি ঠেকিয়ে রাখছি। কেউ ভোট চাইতে আসেনি। বাড়িটা বাঁচাতে পারলে তবেই ভোট দেব।’
চরাঞ্চলের মানুষের লড়াই
‘নদীর তীরে বাস, ভাবনা বারোমাস’ প্রবাদটি রাজাপুর, রূপাপুর, কন্দর্পপুর, মোহাম্মদ আলী ও দক্ষিণ রাজাপুরের মানুষের জীবনের সঙ্গে শতভাগ মিলে যায়। বর্ষায় জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাস, শীতে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা—এই দুইয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করেই বেঁচে থাকতে হয়।
ইলিশা ইউনিয়নের ভোটার ও বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দিন ফরাজি বলেন, মেঘনার চরে হাজার হাজার মানুষ চাষাবাদ, মাছ শিকার করে বেঁচে ছিল। কিন্তু অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে দুই বছরের মাথায় সব বসতভিটা ও জমি নদীতে চলে গেছে। এটা মানুষের সৃষ্ট সংকট, এর সমাধান দরকার।
ভোলার মুসলিমপাড়ার ভোটার ও উদীচীর সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, নদী ভাঙছে সরকারের ব্যর্থতায়। তাই ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে পুনর্বাসনের আইন করা জরুরি।
ভোলা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সভাপতি মোবাশ্বির উল্লাহ চৌধুরী বলেন, শিকস্তি বা পয়স্তি নিয়ে সরকারের কোনো নির্ভরযোগ্য জরিপ নেই। ফলে জেগে ওঠা জমি পেতে মানুষকে বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে হয়। এই সুযোগে প্রভাবশালীরা জমি দখল করে। সংসদে গেলে এই আইন সংশোধন করতেই হবে। জেগে ওঠা জমি মালিক ফিরে পাবেন, অন্য কোনো আইন নয়।
বেকারত্ব, মাদক ও অবকাঠামোর সংকট
ধনিয়া ইউনিয়নের ভোটার ও ব্যবসায়ী আসলাম গোলদার বলেন, নদীভাঙনে একসময়ের সচ্ছল মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। বেকার যুবকেরা মাদকে জড়াচ্ছে। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি মো. সোলাইমান বলেন, টেকসই বাঁধ দিয়ে ভোলার চারপাশে মেরিন ড্রাইভ হলে ইকোট্যুরিজম গড়ে উঠতে পারে। অথচ ক্ষমতাসীনদের অবৈধ বালু উত্তোলন ভাঙন আরও বাড়াচ্ছে।
কালীবাড়ি সড়কের ভোটার ও নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব এস এম বাহাউদ্দিন বলেন, ভোলায় হাসপাতাল আছে, কিন্তু চিকিৎসক নেই। ৯৫ শতাংশ পদ শূন্য। রেফার করতে করতে মানুষ মারা যাচ্ছে।
গাজীপুর রোডের ভোটার ও জীবন-পূরাণ আবৃত্তি একাডেমির পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, ভোলা-ঢাকা যেতে লঞ্চে ৬-৭ ঘণ্টা লাগে, খরচ ৩-৪ হাজার টাকা। অন্তত পরীক্ষামূলক ঢাকা-ভোলা বিমান চালু করা দরকার। তিনিসহ একাধিক ভোটার বলেন, সড়কপথে দ্রুত ঢাকা, বরিশাল যাওয়ার জন্য ভোলাবাসী ভোলা-বরিশাল সেতু দাবি করে আসছেন। কিন্তু সেতুর নকশা করতে করতে ক্ষমতাসীনরা কোটি কোটি টাকা লোপাট করেছে। কিন্তু ভোলাবাসীর জন্য কিছু হয়নি। এখানে শুধু লুটপাটের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রার্থীদের বক্তব্য
বিএনপি–সমর্থিত বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, ‘ভোলার গ্যাস দিয়ে শিল্পকারখানা এবং মেডিক্যাল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও ভোলা-বরিশাল সেতুর কথা সবাই বলছে। কিন্তু আমি ক্ষমতায় না থেকেও এসব দাবিতে আন্দোলন করেছি। সংসদে গেলে দাবিগুলো বাস্তবায়ন করব, ইনশা আল্লাহ।’
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ৫৪ বছরেও ভোলার মানুষ মৌলিক মানবাধিকার পায়নি। ভোলা থেকে শুধু নেওয়া হয়েছে, দেওয়া হয়নি।
ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ওবায়েদ বিন মোস্তফা বলেন, প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নের অভাবই ভোলার মূল সমস্যা। গ্যাস আবিষ্কারের ৩৬ বছরেও একটি শিল্প হয়নি ভোলায়।
সব প্রার্থীই বলছেন, ক্ষমতায় গেলে ভোলার সমস্যার সমাধান করবেন। কিন্তু নদীভাঙনে ঘরহারা মানুষের প্রশ্ন এখন একটাই, এবার সত্যিই কি কেউ কথা রাখবেন, নাকি ভোলাবাসী আবারও প্রতারিত হবেন?