কাঁচা মাছ খেয়ে এক মাস সাগরে ভেসে থাকা শ্রীলঙ্কান বাবা-ছেলে সেফ হোমে, কাল নেওয়া হবে ঢাকায়

উদ্ধার হওয়া শ্রীলঙ্কার দুই জেলেছবি: প্রথম আলো

টানা প্রায় এক মাস সমুদ্রে ভেসেছিলেন। মজুত খাবার শেষ হয়ে যাওয়ার পর বড়শির টোপ ও সমুদ্র থেকে ধরা কাঁচা মাছ খেয়েই বেঁচেছিলেন শ্রীলঙ্কার দুই জেলে। বঙ্গোপসাগরে ভাসতে থাকা অবস্থায় কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলের কাছে তাঁরা উদ্ধার হন। আজ সোমবার আদালতের নির্দেশে তাঁদের সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন সেফ হোমে পাঠানো হচ্ছে। আগামীকাল মঙ্গলবার সকালে তাঁদের ঢাকায় নেওয়ার কথা রয়েছে।

উদ্ধার হওয়া দুই ব্যক্তি হলেন শ্রীলঙ্কার এস এইচ চামিন্দা (৫১) ও তাঁর ছেলে সাউন্ডা হান্নাদিগিপিয়াওয়াটিং (৩০)। তাঁরা শ্রীলঙ্কার ডেভিনুওয়ারা এলাকার রুরাল হসপিটাল রোডের বাসিন্দা। পেশায় দুজনই জেলে।

মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুস সুলতান প্রথম আলোকে বলেন, গত দুই দিনে শ্রীলঙ্কার দুই জেলের বিষয়ে শ্রীলঙ্কার বাংলাদেশ দূতাবাস, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আজ সোমবার দুপুরে তাঁদের মহেশখালী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাঁদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আগপর্যন্ত সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন সেফ হোমে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

ওসি বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামীকাল সকালে দুই শ্রীলঙ্কান জেলেকে সড়কপথে ঢাকায় পাঠানো হবে। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁদের শ্রীলঙ্কায় ফেরত পাঠানো হবে। তবে তাঁদের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া ছোট ট্রলারটি শ্রীলঙ্কায় পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ওসি আবদুস সুলতান বলেন, হাজার হাজার কিলোমিটার উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে ট্রলারটি শ্রীলঙ্কায় পাঠানো সম্ভব নয়। আদালত ট্রলারটি বঙ্গোপসাগর থেকে উদ্ধারকারী ট্রলারের মালিক জিয়াউর রহমানকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, তিনিই গভীর সমুদ্র থেকে ঝুঁকি নিয়ে ভাসমান ট্রলারটি রশি দিয়ে বেঁধে মহেশখালী উপকূলে নিয়ে এসেছেন।

আরও পড়ুন
এই নৌকা নিয়ে ৩৬ দিন আগে মাছ ধরতে সাগরে গিয়েছিলেন তাঁরা। এরপর ইঞ্জিন বিকল হয়ে ভাসতে ভাসতে চলে আসেন বাংলাদেশের উপকূলে
ছবি: প্রথম আলো

যেভাবে উদ্ধার

গত বুধবার গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জিয়াউর রহমানের ট্রলারের জেলেদের নজরে আসে ইঞ্জিন বিকল হয়ে ভাসতে থাকা একটি ছোট ট্রলার। কাছে গিয়ে তাঁরা দেখেন, তাতে দুই ব্যক্তি অসহায় অবস্থায় পড়ে আছেন। তাঁরা হাতজোড় করে সাহায্যের আকুতি জানাচ্ছিলেন। পরে দুই জেলেকে উদ্ধার করে নিজেদের ট্রলারে তুলে নেওয়া হয় এবং ভাসমান ট্রলারটি রশি দিয়ে বেঁধে গত শুক্রবার রাতে মহেশখালী উপকূলে নিয়ে আসা হয়।

এরপর শ্রীলঙ্কার দুই জেলে কুতুবজোম ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা ও ট্রলারমালিক জিয়াউর রহমানের বাড়িতে ছিলেন। শনিবার রাতে তাঁদের পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।

উদ্ধারকারী ট্রলারের মালিক জিয়াউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শ্রীলঙ্কান ভাষা বুঝতে সমস্যা হওয়ায় দুবাইপ্রবাসী তাঁর এক আত্মীয়ের সহায়তায় দুই বিদেশি নাগরিকের পরিচয় ও ঘটনার বিস্তারিত জানা গেছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৩৬ দিন আগে ৪ জেলে একটি ট্রলার নিয়ে শ্রীলঙ্কার উপকূলে মাছ ধরতে যান। বৈরী আবহাওয়ায় ট্রলারটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে সেটি ভেসে আন্দামান সাগরের দিকে চলে যায়। তিন দিন পর অন্য একটি নৌকার সহায়তায় দুই জেলে দেশে ফিরে যান। তবে ট্রলারটি নিজেদের হওয়ায় বাবা-ছেলে সেটিতেই থেকে যান।

এর সাত-আট দিন পর মিয়ানমারের কিছু লোক তাঁদের ট্রলারে উঠে দুরবিন, ক্যামেরাসহ মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নিয়ে যায় বলে তাঁরা জানিয়েছেন। একপর্যায়ে ট্রলারটি ভাসতে ভাসতে বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী উপকূলের কাছে পৌঁছায়। যাত্রা শুরুর সাত দিনের মাথায় তাঁদের মজুত খাবার শেষ হয়ে যায়। এরপর টানা ২৯ দিন বড়শির টোপ ও সমুদ্র থেকে ধরা কাঁচা মাছ খেয়ে বেঁচেছিলেন তাঁরা।

আরও পড়ুন