মানুষের অনবরত আসা-যাওয়ায় লালনের আখড়াবাড়ির সামনের সড়কটিতে জট বেঁধে থাকছে। গেল কয়েক বছরের তুলনায় এবার সাধু-ভক্তদের পদচারণ অনেক বেশি। ভক্তদের তাই আনন্দেরও কমতি নেই। যে যেভাবে পারছেন, বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গান ধরছেন, তাতে সুর মেলাচ্ছেন সাধারণ দর্শনার্থীরাও।
বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহর তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় এক হয়েছেন ভক্তরা। গতকাল সোমবার বিকেলে শুরু হওয়া সাধু-বাউলদের অষ্টপ্রহর (এক বিকেল থেকে আরেক বিকেল পর্যন্ত) আজ মঙ্গলবার শেষ হয়। এদিন ভোরে সূর্য ওঠার মুহূর্তে শুরু হয় গোষ্ঠ গান। গুরু-ভক্তের মিলনলীলার নাম গোষ্ঠ গান। সকাল নয়টা পর্যন্ত চলতে থাকে এ গান। বাউলেরা গানে গানে সাঁইজিকে খুঁজে ফিরছেন। তেমনি আগত দর্শনার্থীরাও গান শুনে মনের তৃপ্তি মেটাচ্ছেন।
এরপর সাধুরা ‘বাল্যসেবা’ নেন। এতে থাকে দই-মিষ্টিসহ বিভিন্ন ধরনের ফল। ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম শেষে চলতে থাকে গুরু-ভক্তের ‘দৈন্য ও প্রবত্ত’ (প্রশ্ন-উত্তর) গান। আত্মার মুক্তির পথ দেখানোই হলো গুরু-ভক্তের দৈন্য ও প্রবত্ত গান। গুরুকে ঘিরে শিষ্যরা প্রেমজুড়ি, মন্দিরা, একতারা, দোতরা বাজিয়ে গানের সুরের সঙ্গে মাথা দোলাতে থাকেন। ‘কী করি কোন পথে যাই, মনমাঝি ঠাহর দেখিনি’—ভক্ত তাঁর গুরুকে গানে গানে এমন প্রশ্ন করেন। উত্তরে গুরুর উপদেশ, ‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন।’
একজনের পর একজন করে গেয়ে চলেন গান। দুপুরের পর বেলা তিনটায় ধামের খাদেম মাইকে প্রচার করেন ‘আল্লা আলেক’। তখন সাধু-গুরুরা সেবা (খাওয়া শুরু) নেন। এটাকে বলে পূর্ণসেবা। জাতি ভেদাভেদ ভুলে সাধু, ভক্ত ও অনুসারীরা ধামের চারপাশে সুশৃঙ্খলভাবে মেঝেতে বসে পড়েন। একে একে সবাইকে সাদা ভাত, মাছ, কলাইয়ের ডাল, সবজি ও দই দেওয়া হয়।
পূর্ণসেবা নিয়ে অষ্টপ্রহরের আয়োজন শেষ হয় প্রকৃত সাধু-বাউলদের আচার। তবে গান গাওয়া ও শ্রোতার স্রোত থেমে নেই। অবিরাম ধারায় সন্ধ্যা থেকে চলতে থাকে গানের পর গান।
সাধুদের আচারের পাশাপাশি লালন একাডেমির আয়োজনে চলছে তিন দিনের অনুষ্ঠান। ভক্ত ও দর্শনার্থীদের পদচারণে মুখর সেই অনুষ্ঠানস্থল। ধামের বাইরে খোলা মাঠজুড়ে বসা মেলায় শত শত মানুষের ভিড়। অনুষ্ঠানমঞ্চে রাতভর গান হয়। সোমবার দিবাগত রাতে গান করেছেন লালন একাডেমির বিভিন্ন বয়সী শিল্পীরা। মঞ্চে গেছেন বাউল শিল্পী শফি মণ্ডলও। বুধবার মধ্যরাতে একাডেমির আয়োজন শেষ হবে।
বাউলেরা বলছেন, লালন দর্শনে তাঁরা অমৃত বাণী পেয়েছেন। তাই তো আত্মার টানেই সাঁইজির বারামখানায় ছুটে এসেছেন। সব ধর্মের ঊর্ধ্বে থেকে মরমি সাধক ফকির লালন মানবমুক্তির জন্য সৃষ্টি করেছিলেন ফকিরি মতবাদ। তাঁর মানবমুক্তির আলোকিত সৃষ্টি বাউল গান নিয়ে সারা বিশ্বের ভক্ত ও অনুরাগীরা তাঁকে চেনেন, জানেন ও হৃদয়ে লালন করেন।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় লালন একাডেমির আয়োজনে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সংষ্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব আবুল মনসুর। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনা শেষে শুরু হয় লালন একাডেমির শিল্পী ও বাউলদের গান।