হাসি–খুশি তিন মেয়ের মা–বাবা এখন কী নিয়ে বাঁচবেন

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দুর্ঘটনায় নিহত মাদ্রাসাছাত্রীর বাবা নাছির উদ্দিন কথা বলা শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। গতকাল দুপুরে মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ইউনিয়নের পোলমোগরা গ্রামেছবি: প্রথম আলো

‘হাসি–খুশি তিন বোন একসঙ্গে মাদ্রাসায় গিয়েছিল। হাত ধরাধরি করে রাস্তাও পার হয়েছিল একসঙ্গে। প্রায় দেখতাম, এই পথে হেঁটে যাচ্ছে তারা। সেই দৃশ্য আর দেখা যাবে না।’ চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ইউনিয়নের পোলমোগরা গ্রামের রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন কয়েকজন গ্রামবাসী। সড়ক দুর্ঘটনার শিকার তিন বোনের বাড়ির ঠিকানা জানতে চাইলে বিষণ্ন গলায় কথাগুলো বলেন তাঁরা।

সারি সারি ধানখেত, লাউয়ের মাচা আর পুকুরপাড় ধরে পৌঁছে যাই তিন মেয়ের বাবা নাছির উদ্দিনের বাড়িতে। পেশায় হোমিও চিকিৎসক তিনি। বুধবার বেলা ১১টায় তাঁর আধা পাকা বাড়িতে গেলে এলাকার কয়েকজন জানালেন, বাড়ির পাশের বড়তাকিয়া বাজারে চেম্বারে বসে রোগী দেখেন। রোজগার ভালোই। স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস আর তিন মেয়েকে নিয়ে সুখের সংসার ছিল। কিন্তু গতকাল সকালের একটি সড়ক দুর্ঘটনা সেই সুখের ছবিটাকে দুমড়েমুচড়ে দিল। মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে ট্রাকচাপায় ঘটনাস্থলে নিহত হয় নাছিরের বড় মেয়ে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী খাদিজা মাশমুম (১৫)। আহত হয় মেজ মেয়ে তৌফিয়া তাবাসসুম (১৩) ও ছোট উম্মে হাবিবা (১১)। তাদের মধ্যে উম্মে হাবিবার অবস্থা গুরুতর। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে তার।

নিহত খাদিজা মাশমুম বড়তাকিয়া জাহেদিয়া দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণি শিক্ষার্থী। তৌফিয়া একই মাদ্রাসার নবম শ্রেণিতে ও ছোট বোন উম্মে হাবিবা সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বুধবার সকাল সাড়ে নয়টায় মিরসরাই উপজেলার বড়তাকিয়া বাজার এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চট্টগ্রামমুখী লেনে মাদ্রাসা গেটে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এই দুর্ঘটনায় মোবারক হোসেন (৪০) নামের এক পথচারীও নিহত হন। মোবারক মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ইউনিয়নের পূর্ব পোলমোগরা গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে।

গতকাল বিকেলে নাছির উদ্দিনের আদি বাড়ি উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের আমবাড়িয়া গ্রামের কবরস্থানে জানাজা শেষে দাফন করা হয় খাদিজা মাশমুমকে। খাদিজার বাবা নাছির উদ্দিন বলেন, ‘আমার মেয়ের যেভাবে মৃত্যু হয়েছে, এমনটি যেন আর কারও সন্তানের বেলায় না ঘটে।’

উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের মধ্যম আমবাড়িয়া গ্রামে মূল বাড়ি হলেও একই ইউনিয়নের পোলমোগরা গ্রামে নতুন বাড়ি করেছেন খাদিজার বাবা নাছির উদ্দিন। নতুন বাড়ির উঠানে স্বজন প্রতিবেশীদের ভিড়। উঠানের এক পাশের চেয়ারে বসে আছেন খাদিজার বাবা নাছির উদ্দিন। শোকে বাকরুদ্ধ তিনি। উঠানের আরেক পাশে পর্দা টানিয়ে রাখা হয়েছে নিহত খাদিজার লাশ। লাশ ঘিরে আহাজারি করছিলেন মা জান্নাতুল ফেরদৌস।

নিহত মাদ্রাসাছাত্রীর লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। গতকাল সকালে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

গতকাল বিকেলে নাছির উদ্দিনের আদি বাড়ি উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের আমবাড়িয়া গ্রামের কবরস্থানে জানাজা শেষে দাফন করা হয় খাদিজা মাশমুমকে। জানাজায় খাদিজার বাবা নাছির উদ্দিন বলেন, ‘আমার মেয়ের যেভাবে মৃত্যু হয়েছে, এমনটি যেন আর কারও সন্তানের বেলায় না ঘটে।’

নিহত খাদিজা আর তার দুই বোন বড়তাকিয়া জাহেদীয়া মাদ্রাসার ছাত্রী। ওই মাদ্রাসার সহকারী অধ্যক্ষ মো. জহিরুল হক কোনোভাবেই মানতে পারছেন না তার ছাত্রীর মৃত্যু। তিনি বলেন, ‘খাদিজা খুবই মেধাবী ছিল। এভাবে মাদ্রাসার সামনে তার মৃত্যু হবে, আমরা ভাবতেই পারছি না।’

তিন বোনকে চাপা দেওয়া ট্রাকটি পাশের পুকুরে গিয়ে পড়ে। গতকাল সকালে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

ঘটনাটি একরকম তাঁর চোখের সামনেই ঘটেছে বলে জানান জহিরুল হক। তিনি বলেন, ‘বুধবার সকাল সাড়ে নয়টা থেকে মাদ্রাসা মাঠে শিক্ষার্থীদের নিয়ে পিটি প্যারেডের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আমরা। তখন হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে সবাই মহাসড়কের দিকে যাই। দেখা যায়, সড়কের পাশে থামানো একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে ধাক্কা দিয়ে পণ্যবাহী একটি ট্রাক পাশের পুকুরে উল্টে পড়ে আছে। এর আগে ট্রাকটি মাদ্রাসার তিনছাত্রীসহ কয়েকজনকে চাপা দেয়। ঘটনাস্থলে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী খাদিজা মাশমুমসহ আহতরা পড়ে ছিল। তাদের মধ্যে খাদিজা মারা যায়। তার অন্য দুই বোন আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। তাদের মধ্যে মেজ বোন তৌফিয়া তাবাসসুমকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। ছোট বোন উম্মে হাবিবার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় সে এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

নাছির উদ্দিনের তিনটিই মেয়ে। মেয়েরা খুব আদরের ছিল বাবা-মায়ের। মেয়েদের ঘিরেই ছিল সব স্বপ্ন। পোলমোগরা গ্রামের বাড়ির উঠানে বসে কয়েকজন স্বজন জানালেন, তিন মেয়ের মা জান্নাতুল ফেরদৌস একেবারেই ভেঙে পড়েছেন। বারবার তিনি মেয়েদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

নাছির উদ্দিনের তিনটিই মেয়ে। মেয়েরা খুব আদরের ছিল বাবা–মায়ের। মেয়েদের ঘিরেই ছিল সব স্বপ্ন। পোলমোগরা গ্রামের বাড়ির উঠানে বসে কয়েকজন স্বজন জানালেন তিন মেয়ের মা জান্নাতুল ফেরদৌস একেবারেই ভেঙে পড়েছেন। বারবার তিনি মেয়েদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন। বড় মেয়ে তো চলেই গেল, ছোট মেয়েও হাসপাতালে। এমন শোক নিয়ে কীভাবে বাঁচবেন এই দম্পতি।

এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। জোরারগঞ্জ হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘বড়তাকিয়া বাজার এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি দুটি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা না হলে আমরা উদ্যোগে হয়ে মামলা করব।’